ভুলতে বসা হাম ফিরেছে ভয়ংকর রূপে, বিশ্বে আক্রান্তের শীর্ষে বাংলাদেশ
- প্রকাশের সময় : ১২:৫৮:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
- / 16
ভুলতে বসা রোগ হাম এ বছর বাংলাদেশে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে বিশ্বের আর কোনো দেশে এত রোগী শনাক্ত হয়নি।
ডব্লিউএইচওর বিশ্বব্যাপী হাম ও রুবেলা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত নজরদারি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বিশ্বের ১৬৫ দেশে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম বা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে হামের সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ হাজার ৬০৭ জন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেন, যেখানে রোগী পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৫২১ জন। এরপর রয়েছে মেক্সিকো, পাকিস্তান, ক্যামেরুন, কাজাখস্তান, গুয়েতেমালা, অ্যাঙ্গোলা ও সুদান।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এবার হামের সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করার অন্যতম কারণ টিকাদানে ঘাটতি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ যে এবার হামের সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা ধরেই নেওয়া যায়। শুধু সংক্রমণের দিক থেকে নয়, বাংলাদেশে সম্ভবত এবার হামে মৃত্যু বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে হামের সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন। এ সময়ে ১৪ হাজার ৭০৮ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭০২ জনের। এছাড়া হাম নিশ্চিত হয়ে মারা গেছে ৯৫ শিশু। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ সময়ে ৭৯৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তবে কয়েক বছর আগেও দেশের হাম পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণে। ২০২৫ সালে দেশে হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭ জন, ২০২৩ সালে ২৮২ জন এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলতি বছরের মার্চে হামের রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারে পৌঁছায়। এপ্রিলে তা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং মে মাসে রোগী পাওয়া যায় প্রায় ১৫ হাজার।
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশ যে এবার হামের সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা ধরেই নেওয়া যায়। শুধু সংক্রমণের দিক থেকে নয়, বাংলাদেশে সম্ভবত এবার হামে মৃত্যু বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।
টিকাদানে ঘাটতিতে বেড়েছে সংক্রমণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় দেশে হামের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। একসময় টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ কার্যক্রমে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নিয়মিত টিকাদানের হার নেমে আসে ৫৯ শতাংশে। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বেশি। এক বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজারের বেশি শিশু হামের দুই ডোজ টিকার কোনোটিই পায়নি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে একটি এলাকার অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এর মাধ্যমে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সহায়তা করে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘হার্ড ইমিউনিটি এক দিনে তৈরি হয় না, আবার এক দিনে ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় কাভারেজ না হলে ধীরে ধীরে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। এর ফল হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
সৌজন্যে: প্রথম আলো




















