শিক্ষাখাতে পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়নে স্থবিরতা!
- প্রকাশের সময় : ০৮:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫
- / 421
শিক্ষাখাত—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। এই খাতের উন্নয়নে একের পর এক পরিকল্পনা গৃহীত হয়; প্রণয়ন হয় নীতিমালা, সুপারিশ ও কৌশলপত্র। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—পরিকল্পনার অগ্রগতি যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা ততটাই হতাশাজনক। এই কারণে বাস্তবায়নে দেখা দিচ্ছে অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা। পরিকল্পনার আলো যেমন উদ্দীপনা জাগায়, তেমনি তা সিদ্ধান্তহীনতার অন্ধকারে এসে নিভে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের ভূমিকাও আলোচনাযোগ্য। তিনি একসময় একইসঙ্গে শিক্ষা ও পরিকল্পনা—উভয় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় তিনি দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক, শিক্ষকনেতা ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষাখাতের দীর্ঘদিনের সংকট, বৈষম্য, অদক্ষ নীতিমালা, এমপিও জটিলতা এবং বেসরকারি শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের বিষয়গুলো সরাসরি শুনেছেন ও উপলব্ধি করেছেন।
এই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করেই তিনি পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে কেবল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে শিক্ষাখাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশ্বাস দেন। তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাখাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়—বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও বৈষম্য দূরীকরণে নেওয়া হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অর্থ উপদেষ্টাও সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি প্রশংসনীয় অগ্রগতি।
বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা জনাব সি আর আবরারও বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করে বারবার বলেছেন—শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যে শিক্ষাখাত নিয়ে আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
তিনি সরাসরি বলেছেন—এমন একটি সম্মানজনক ও সময়োপযোগী বেতন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতায় আসতে উৎসাহিত ও আকৃষ্ট হয়। না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তবু সমস্যার মূলে রয়েছে বাস্তবায়নের সেই পুরনো দীর্ঘসূত্রতা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এলেই শুরু হয় আমলাতান্ত্রিক গড়িমসি, দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতা এবং একঘেয়ে অজুহাতের চক্র: “ফাইল প্রস্তুত নয়”, “উর্ধ্বতনের অনুমোদন লাগবে”, “আলোচনার সময় হয়নি”—এগুলো যেন নিয়মিত ছকে পরিণত হয়েছে। যেন সময়কে আটকে রাখা হয়েছে দাপ্তরিক জালে।
এই প্রশাসনিক জটিলতা শিক্ষাখাতের স্বপ্নগুলোকে প্রতিনিয়ত ব্যর্থতায় ঠেলে দিচ্ছে। দিনের শুরুতে যেসব স্বপ্ন আঁকা হয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে, তা সন্ধ্যার ছায়ায় এসে থেমে যায়। আলোচনার টেবিলে পড়ে থাকে ফাঁকা চেয়ার, ঝুলে থাকে সিদ্ধান্ত, থেমে যায় সম্ভাবনার পথরেখা।
বাস্তবায়নের এই স্থবিরতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি নীতিমালার জটিলতা। বছরের পর বছর একক, স্বচ্ছ নীতিমালা দাবি করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। সদ্য ঘোষিত সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার পৃথক নীতিমালা মাঠপর্যায়ে নতুন বিভ্রান্তি, বৈষম্য ও হয়রানি তৈরি করেছে—ফলে শিক্ষকসমাজে ক্ষোভ বাড়ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যা শিক্ষাখাতের বাস্তবায়ন-সংকটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। পরিকল্পনা কমিশনের বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট—সবই রয়েছে, কিন্তু নেই সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত ও দক্ষ বাস্তবায়ন।
অন্যদিকে যাঁরা বাস্তবায়নের দায়িত্বে, সেই আমলারা প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ বরাদ্দে বেশি আগ্রহী। এই প্রবণতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন—“যত বেশি মিটিং, তত বেশি সিটিং, আর তত বেশি সিটিং এলাউন্স।” এই কারণেই প্রকল্প গ্রহণ ও বাজেটে প্রকল্প বাবদ বরাদ্দে অনেক কর্মকর্তার অতিরিক্ত আগ্রহ দেখা যায়।
ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বছরের শেষ দিকে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচে চাপ থাকায় নামমাত্র কিছু প্রশিক্ষণের আয়োজন হয়, যেখানে শিক্ষকদের ডেকে ডেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কিন্তু তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না। টাকা খরচ হয়, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ঘটে না।
তাই পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দক্ষ বাস্তবায়ন ও বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার। কেবল খসড়া তৈরি নয়—বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যেন না পড়ে স্থবিরতার জট।
শিক্ষাখাতে একটি সিদ্ধান্ত কেবল শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর নয়, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। সিদ্ধান্তহীনতা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষকদের মনোবল, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের আগ্রহ এবং মানসিক সুস্থতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে তাঁরা হতাশায় ভোগেন, শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে।
আজকের বাংলাদেশ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু স্মার্ট সিদ্ধান্ত ও দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।
পরিকল্পনা যেন সকালবেলার আলো জ্বালানো দীপক—কিন্তু সন্ধ্যার ধোঁয়ায় অকার্যকর হয়ে যাওয়ার লজ্জা ছাড়া কিছু নয়। পরিকল্পনায় আশাবাদ থাকতেই পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা সেই আশার আলো নিভিয়ে দিতে পারে।
দিনশেষে তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—পরিকল্পনা কি কেবল সকালে আলো জ্বালায়, নাকি সন্ধ্যার বাস্তবতায় নিঃশব্দে নিভে যায়?
বিশেষ প্রস্তাবনা :
নীতিনির্ধারকদের উচিত শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নকে শিক্ষানীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা, কারণ তাঁরাই জাতি গঠনের কারিগর। শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সিদ্ধান্তহীনতা, আমলাতান্ত্রিক জট এবং অদক্ষ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। এই অবস্থার উত্তরণে চাই সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ:
* প্রথমত: বদলি নীতিমালার প্রক্রিয়াকে সার্বজনীন, স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত ও সময়সীমা নির্ধারণ করে সম্পন্ন করতে হবে।
* দ্বিতীয়ত: প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ যেন অপ্রয়োজনীয় মিটিং, সিটিং এলাউন্স বা নামমাত্র প্রশিক্ষণে অপচয় না হয়ে সরাসরি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ব্যয় হয়—তা কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
* তৃতীয়ত: একটি শক্তিশালী বাস্তবায়ন তদারকি সেল গঠন করতে হবে, যাঁরা পরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করবে।
* চতুর্থত: সুশাসন ও জবাবদিহিতা ছাড়া শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ও প্রকল্প সফলতা পাবে না; বরং তা জনগণের করের অর্থের অপচয় হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
* পঞ্চমত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার দৃশ্যমানতা। কারণ, আজকের একটু বিলম্ব আগামী প্রজন্মকে মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
শিক্ষকসমাজ মনে করেন—তাঁদের আগে পেটের ক্ষুধা মেটানোর ব্যবস্থা না রেখে শুধু প্রশিক্ষণের ফরমান দিয়ে শিক্ষা উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া প্রশিক্ষণ কেবল এক তরফা আনুষ্ঠানিকতা। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই অমর পঙ্ক্তি—
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় / পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে, আগে শিক্ষকদের জীবনমান নিশ্চিত করাই হবে প্রথম ও প্রধান শর্ত। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে—কেবল পরিকল্পনার ফাইলে নয়।
লেখক: মো. মাহবুবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ
ইমেইল: mmrrajbari71@gmail.com

























