বাছুর হাতে ধরিয়ে ফটোসেশন, ডিম-খিচুড়ি খাইয়ে দেওয়া হলো বিদায়!
- প্রকাশের সময় : ০৪:১১:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৫
- / 141
প্রকল্পের নাম হতদরিদ্রদের মাঝে উন্নত জাতের বাছুর বিতরণ। বরাদ্দ পাঁচ লাখ টাকা। সুফলভোগী ১০ জন নারী। কিন্তু তাদের বাছুর দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে বাছুর হাতে ধরিয়ে ছবি তুলে বিদায় করা হয়েছে। কিন্তু কাউকে বাছুর (গরুর বাচ্চা) দেওয়া হয়নি। খামার থেকে ১০টি বাছুর এনে ছবি তোলা শেষে আবার খামারেই ফেরত পাঠানো হয় বাছুরগুলো।
ফটোসেশনের দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনও তাদের বাছুর বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ প্রকল্পের টাকা পুরোটাই আত্মসাতের অপচেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পাবনার চাটমোহর উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়নের রেলবাজার এলাকার মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক এম এস আলম বাবলুর বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী জানান, গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের (বিএনএফ) আর্থিক সহায়তায় মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থা এনজিও’র উদ্যোগে ১০ জন দুস্থ নারীকে বাছুর দেওয়ার কথা বলে রেলবাজারে নিয়ে আসা হয়। নিজের পরিচিত একটি খামার থেকে ১০টি বাছুর গাড়িতে করে নিয়ে আসেন এনজিওটির নির্বাহী পরিচালক এম এস আলম বাবলু। এরপর এলাকার কিছু ব্যক্তিকে তার বাসভবন সংলগ্ন এনজিও’র সামনে ডেকে এনে ওই ১০ নারীকে দাঁড় করিয়ে গরু দেওয়ার ফটোসেশন করেন।
পরে বাছুর না দিয়ে খিচুড়ি আর ডিম খাইয়ে বিদায় করা হয় সুফলভোগী নারীদের। এরপর বাছুরগুলো আবার একই গাড়িতে করে একই খামারে ফেরত দিয়ে আসা হয়। সেখানে উপস্থিত অনেকেই গরু কখন দেওয়া হবে জানতে চাইলে নির্বাহী পরিচালক বাবলু জানান, পরে দেওয়া হবে।
কুবিরদিয়ার মাঠপাড়া গ্রামের আলম হোসেনের মেয়ে খুশি খাতুনকে তার স্বামী ছেড়ে দিয়েছেন। তাই বাবার বাড়িতে এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। অন্যের বাড়িতে ও মাঠে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান।
তিনি বলেন, ট্রেনিংয়ের কথা বলে আমাকে ডেকে নিয়ে যায়। বাছুর হাতে ধরিয়ে ছবি তোলে। কিন্তু আমাকে বাছুর দেয় নাই। বলছে, এবার অন্য এলাকার লোকদের দেব, পরের বার তোমাকে দেব। পরে খিচুরি আর ডিম খাওয়ায় বিদায় করছে আমাদের। বাবলু কাকা ত্যাড়া মানুষ। বেশি কথা বললে আবার ধমক দেয়। তাই আর কিছু বলার সাহস পাই নাই।
খুশি আরও বলেন, এর আগে একবার আমাকে একটা ছাগল দিয়েছিল বাবলু কাকা। তবে সেজন্য আমার কাছ থেকে নগদ ১৩০০ টাকা নিয়েছিল। এছাড়া পরে একটি গর্ভবতী ছাগলও নিয়েছিল।
অন্যের বাড়িতে রান্না করে সংসার চালানো এক গৃহবধূ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের বাছুর দেওয়ার কথা বলে ট্রেনিংয়ে ডেকে নেয়। তারপর ট্রেনিং শেষে আমাদের বাছুরসহ ছবি তুলে বিদায় করছে। বলছে, এখন না, পরে দেব। এখনও পর্যন্ত বাছুর পাইনি। ট্রেনিংয়ে আমরা বিভিন্ন গ্রামের ১০ জন নারী ছিলাম।
যে গাড়িতে বাছুরগুলো আনা নেওয়া করেছে, সেই গাড়ি চালক শুভ দাস বলেন, ওই দিন আমার গাড়ি নিয়ে মথুরাপুর এলাকার একটি গরুর খামার থেকে ১০টা বাছুর নিয়ে রেলবাজার বাবলু সাহেবের বাসার সামনে নেয়। পরে অনুষ্ঠান শেষে ওখান থেকে বাছুরগুলো আবার মথুরাপুরের একই খামারে নামিয়ে দেওয়া হয়। এর বেশি কিছু জানা নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, আমাকে অতিথি করে দাওয়াত দিয়েছিল, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে যেতে পারিনি। প্রকল্পটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা নেই। তবে আমার অফিস থেকে প্রত্যয়ন দেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি প্রত্যয়ন নেওয়ার জন্য রিপোর্ট অফিসে জমা দিয়েছেন কি না দেখে বলতে পারব। তবে এ রকম অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সে মোতাবেক প্রত্যয়ন দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের (বিএনএফ) উপ-মহাব্যবস্থাপক (কর্মসূচি) মোস্তফা কামাল ভূঞার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশেষ প্রকল্পের আওতায় মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থা নামের এনজিওকে আমরা পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। তার মধ্যে প্রথম অবস্থায় তিন লাখ টাকা দিয়েছি। কার্যক্রমের সন্তোষজনক রিপোর্ট পেলে তাকে বাকি দুই লাখ টাকা দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট ইউএনও বা তার প্রতিনিধিকে একিভূত করে কাজ করার নির্দেশনা রয়েছে। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের রিপোর্টে ইউএনওর প্রত্যয়ন লাগবে। ১৫/২০ দিনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এখনও তার রিপোর্ট হাতে পাইনি। আমরা বিষয়টি পর্যক্ষেণ করছি। রিপোর্ট আসার পর যাচাই বাছাই করে দেখব, ঘাপলা পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এনজিও মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এম এস আলম বাবলু বলেন, আমরা ১০ জন ছাড়াও আরও কয়েকজনকে ডেকেছিলাম। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে৷ ১০ জনকে বাছুর দেওয়া হয়েছে। বাকিদের পরের প্রকল্পে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।






















