সেদিন মানুষের হার না মানার নতুন রূপকথা লিখেছিলেন ম্যাক্সওয়েল

- প্রকাশের সময় : ০২:৩০:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / 1

অস্ট্রেলিয়ার জয়ের পর অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বলেছিলেন, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটি ‘ওয়ানডেতে সর্বকালের সেরা’। বীরেন্দর শেবাগের রায়ও তাই ছিল। ২০২৩ বিশ্বকাপে ওয়াংখেড়েতে সেদিন আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাক্সওয়েলের অপরাজিত ২০১ ঠাঁই করে নিয়েছে ক্রিকেট ইতিহাসে হিরণ্ময় ইনিংসগুলোর পাতায়। কদিন আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া ম্যাক্সওয়েলের অতিমানবীয় সেই ইনিংসেরই আজ ৩ বছর পূর্তি। সেই ইনিংস নিয়ে লেখাটি পুনরায় প্রকাশ করা হলো।
খেলার মাঠের প্রেক্ষাপট ও মূল মুহূর্ত
আধুনিক উপন্যাস, হয়তো আধুনিক মানুষেরও যাত্রা শুরু মিগেল দ্য সেরভান্তেসের ‘দন কিহোতো’ থেকে। দন কিহোতোয় লা মাঞ্চার এক বোকা যুবক অবিশ্বাস্য সব অভিযানে বের হতো। বলা বাহুল্য, সেসব অভিযানগুলো ছিল অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত, ফলে কিহোতো কখনো সফল হতে পারেননি।গতকাল ৯১ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ জেতাকে মনে হচ্ছিল দন কিহোতোর সেসব অবাস্তব অভিযানের মতোই কিছু একটা; যার প্রমাণ হিসেবে ইএসপিএনক্রিকইনফোর ম্যাচে ‘উইন প্রোবাবিলিটি’র সূচক সামনে নিয়ে আসা যায়। মিচেল স্টার্ক যখন আউট হয়ে ফিরে যান, তখন অস্ট্রেলিয়ার জয়ের সম্ভাবনা ছিল ০.৪৬, মানে আধা পয়েন্টেরও কম।
ম্যাক্সওয়েল যেভাবে অবিশ্বাস্য ইনিংসটি খেললেন
তারপর যা ঘটেছে তা রূপকথার গল্পলেখকও হয়তো নিজের গল্পে ঘটানোর সাহস দেখাবেন না! লেখক বড়জোর একটা ট্র্যাজেডিই সেখানে ঘটাতে পারেন। নাটকীয়তার পর নায়কের হারের গল্পই শেষ পর্যন্ত হয়তো লিখবেন। কিন্তু নিজের গল্পটা ভিন্নভাবে লেখার ব্রত নিয়েই মাঠে এসেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। যেখানে রূপকথার গল্পলেখকও কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কিংবা ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটি দিয়েই যাত্রা শুরু করল রূপকথার নতুন একটি গল্প।
ম্যাচের বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
কিহোতোর গল্পের সঙ্গে আরেকটি মিল আছে ম্যাক্সওয়েলের এই ইনিংসের। কিহোতো যেভাবে সব অভিযানে সঙ্গী হিসেবে সানচো পানশাকে পেয়েছেন, একইভাবে গতকাল অবিশ্বাস্য ইনিংসটি খেলার পথে ম্যাক্সওয়েলকে শেষ পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছেন প্যাট কামিন্স (৬৮ বলে ১২ রান)। রীতিমতো ধ্যানী ঋষির মতো ক্রিজে আগলে দাঁড়িয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক। আর সামনে থেকে উপভোগ করেছেন ম্যাক্সওয়েলের খেলা, অনেকের মতে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ইনিংসটিও।ম্যাক্সওয়েলের নামটি শুনলে সবারই আগে মনে পড়ে স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে পড়া জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল নামের এক পদার্থবিজ্ঞানীর কথা। যিনি তড়িৎ চৌম্বকীয় তত্ত্ব দিয়ে বিজ্ঞানের জগতে অমর হয়ে আছেন। তাঁর সম্পর্কে এটুকুই শুধু জানি। ঠিক একইভাবে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে গতকাল রাতে অমরত্ব পেয়েছেন ক্রিকেটের ম্যাক্সওয়েলও।
ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটে যত রেকর্ড
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটিকে মানব অভিধানের কোনো বিশেষণ দিয়ে বোঝানো রীতিমতো দুঃসাধ্য। ১২৮ বলে ২০১ রানের এ ইনিংসটি খেলেছেন আক্ষরিক অর্থে এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে। শতকের পর থেকে বেশির ভাগ সময় ক্র্যাম্পের যন্ত্রণায় কাতরেছেন। এমনকি এ জন্য সুযোগ থাকার পরও সিঙ্গেল রান নিতে পারেননি। যখনই নিয়েছেন ব্যথায় কুঁকড়ে গেছেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি দেখে ধারাভাষ্যকার ইয়ান স্মিথ বলেছেন, ‘ম্যাক্সওয়েল অন্য প্রান্তে পৌঁছেছেন চার্লি চ্যাপলিনের মতো হেঁটে।’চ্যাপলিন যেমন হাস্যকর ভঙ্গিতে জীবনের গভীর কোনো বেদনার গল্প বলে যেতেন, ম্যাক্সওয়েলের সেই ‘হাস্যকর’ হাঁটাতেও লুকিয়ে ছিল তীব্র যন্ত্রণা। এমনকি যেকোনো সময় ম্যাক্সওয়েল মাঠ ছাড়তে পারেন এই আশঙ্কাতে একাধিকবার বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিলেন সতীর্থ অ্যাডাম জাম্পা। কিন্তু ম্যাক্সওয়েল তো স্বর্গীয় এক ইনিংস খেলে অমরত্ব পেতে চেয়েছেন। তাই কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। নয়তো তিন শর কাছাকাছি রান তাড়ায় এক শর মধ্যে ৭ উইকেট হারানোর পর ৬ নম্বরে নামা ব্যাটসম্যানটি দ্বিশতক করেন কীভাবে! আফগান বোলারদের ওপর ম্যাক্সওয়েল বয়ে গেছেন ঘূর্ণিঝড়ের মতো। সারাক্ষণই যেন ১১ নম্বর বিপৎসংকেত হয়ে আঘাত হেনেছেন তাঁদের ওপর।























