বাবার ফোনে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল তাজমিন, সেই লোকেশনে গিয়ে পান লাশ
- প্রকাশের সময় : ০৩:৩৯:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 20
বাসা থেকে ‘বান্ধবীর বাড়ি’ যাওয়ার কথা বলে গত ৪ অক্টোবর বের হয়েছিল জান্নাতুল তাজমিনের (১৫)। গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লায় লালমাই উপজেলার জগৎপুর মাইনি মুড়া জঙ্গল এলাকার ধানখেত থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
আগের রাতে মেয়ে মোবাইল ফোনে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম। পাঠিয়েছিলেন মেসেজও। তবে ঘুম থাকায় দেখতে পারেননি বলে দাবি তার। পরদিন সেই লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মৃতদেহ পান আবদুল আলীম।
আবদুল আলীম জানান, চার দিন আগে (৪ অক্টোবর) তাজমিন কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সের ধানমন্ডি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয়। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় তাজমিন।
ওই রাতে মেয়েকে একাধিকার কল করেন আবদুল আলীম। তিনি দাবি করেন, মেয়ে কল রিসিভ না করায় তাদের মধ্যে কথা হয়নি।
আব্দুল আলীম বলেন, ‘বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে তাজমিন মোবাইলে মেসেজ এবং লাইভ লোকেশন পাঠায়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে। তখন আমি ঘুম ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’
বৃহস্পতিবার ভোরে স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের আশপাশের ধানখেতজুড়ে ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। মৃতদেহের কিছুটা দূর থেকে একটি সিএনসি জব্দ করা হয়েছে।
নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম একটি ওষুধ কম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করছেন। তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
এ ঘটনায় ঘটনার পর নিহত তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
যা দেখা যাচ্ছে সিসিটিভি ফুটেজে
জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর আগের রাতে চলাচলের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার হোটেল নূরজাহানে সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। বাসটি কক্সবাজার থেকে ফিরছিল। এরপর হোটেলের পাশের খাবার দোকান ও পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলে। এ সময় দোকানিকে কিছু একটা দেখাতে বা কোনো দিক নির্দেশ করতে দেখা যায় তাজমিনকে।
ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর তাজমিন সেখান থেকে সরে অন্য পাশে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তবে এলাকা ছাড়ার পর তাজমীন কোন পথে গিয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তার চলাচলের পথ এবং সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।
নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, কারো সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং জব্দ করা মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে সামান্য দূরে পড়ে থাকা ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
তাজমিনের মৃতদেহ উদ্ধারের স্থলে শুরুতে সিএনজি দেখতে পান বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এরপর একটি ব্যাগ, পরে ধানখেতে মৃতদেহ দেখতে পান তারা। পরে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ সদস্যরা এসে লাশ উদ্ধার করে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, সকালে আশপাশের মানুষদের কাছে শুনতে পাই ধানক্ষেতে একটি সিএনজি পড়ে আছে। খবর শুনে ঘটনাস্থলে এসে দেখি ঘটনা সত্য। সিএনজিটির ২০ থেকে ৩০ গজ দূরেই দেখতে পাই একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। আশপাশের ধানক্ষেতগুলোতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখা যায়। সেই চিহ্ন অনুসরণ করে একটু সামনে গিয়ে দেখি ধানক্ষেতে অজ্ঞাত লাশ পড়ে আছে। মরদেহের মাথা ছিল কাদায়, পুরো শরীর বস্ত্রহীন এবং গলায় গামছা প্যাঁচানো। পরে যখন দেখলাম দলে দলে মানুষ আসছে দেখার জন্য, তখন একটি গামছা দিয়ে নগ্ন শরীর ঢেকে দিই। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে ঘটনার খবর জানাই। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার করে।
জহিরুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ধানক্ষেতের দিকে তাকালেই বুঝা যায় যারা মেয়েটিকে মেরেছে অনেক কষ্ট দিয়েছে। দস্তা দস্তির আলামত দেখা যাচ্ছে। নরপশুদের কাছ থেকে জীবন রক্ষা করতে অনেক চেষ্টা করেছিল। শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেনি। এদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে। ধানগাছগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সড়কের এক পাশে ধানক্ষেতে পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কের ওপর তোলেন।
যা বলছে পুলিশ
গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর ওই কিশোরী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কুমিল্লা এসে পরে সে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে উঠে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। তবে এসব স্থানে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমে মরদেহটি অজ্ঞাত ছিল। পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ ফেরদৌস বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজি চালিত অটোরিকশাটি রেজিস্ট্রেশনকৃত। আমরা সেটির সূত্র ধরে এগোচ্ছি। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। আশা করি, রহস্য উদ্ঘাটন হবে।
























