ডেঙ্গুরোগীর চাপে হাসপাতাল, শয্যার জন্য ছুটছেন স্বজনরা
- প্রকাশের সময় : ০৮:৪৯:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 3
রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে স্বজনদের। কোথাও শয্যার পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতেও চলছে চিকিৎসা। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৪১) গত বুধবার জ্বরে আক্রান্ত হন। দুই দিন পর পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গেলে জানতে পারি শয্যা খালি নেই। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলেও শয্যা ফাঁকা পাইনি। মেঝেতে অসংখ্য রোগী ছিল। পরে মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েও শয্যা না পেয়ে নিজের সামর্থ্যের বাইরে বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হই।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৯৪২ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন ছয়জন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৬৭২ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৩৯ জনের। একই সময়ে ১ হাজার ৭৫১ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। ফলে ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর চেয়ে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেশি।
ঢাকার সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৮৭ জন নতুন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে এসব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ৬২ জন। একই সময়ে মারা গেছেন দুজন। রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১২০ জন। সেখানে বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১৭২ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। রাজধানীর কিছু হাসপাতালে চাপ বেশি, কোথাও কম। তবে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি জানান, স্যালাইন, কিট ও ওষুধের সংকট নেই। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট আগে থেকেই রয়েছে। চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন এবং সাত হাজার নার্স নিয়োগের পরীক্ষা চলছে।
সরেজমিনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা যায়, মেডিসিন ওয়ার্ড ছাড়িয়ে বারান্দা ও করিডরেও ডেঙ্গুরোগী ভর্তি। নারী ও পুরুষের পৃথক ওয়ার্ডের পাশাপাশি মেঝেতেও রোগী রাখা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকেও রোগী নিয়ে আসছেন স্বজনরা। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দদুলাল সাহা বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে শয্যা ১৯০, রোগী ভর্তি আছেন ২২৮ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর অনেক চাপ। ডাক্তার দিয়ে চালিয়ে নিলেও নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট প্রকট।’ এ বিষয়ে নার্সিং অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
শ্যামলী এলাকার তাহমিনা বেগম তাঁর ছেলে ওয়াসিমকে (২২) নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, চার দিন আগে তাঁর ছেলের জ্বর আসে। পরে বমি ও দাঁত দিয়ে রক্ত আসায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪১ হাজার ৮২৬ জন। সেপ্টেম্বরের ২৯ দিনে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫৩৬ জন। আগস্টে মারা যান ৪৩ জন, আর সেপ্টেম্বরের ২৯ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১৪২ জনের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ অব্যাহত থাকলে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক-নার্সসহ চিকিৎসাসেবার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত এবং ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার প্রয়োজন।’
হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর চাপ এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, যশোর, বরিশাল ও পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৫ হাজার ৪২৫ জন ডেঙ্গুরোগী।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন





















