Dhaka ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাবনা কতটা?

সৌমিত্র শীল চন্দন
  • প্রকাশের সময় : ০১:৪২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৫
  • / 282

সারা বিশ্ব জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশেও এরনেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কি না, তা চারটি মানদন্ডে বিবেচনা করা হয় ১. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২. কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে ৩. সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ৪. ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

বাংলাদেশে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক বেশি। তাই উল্লিখিত চারটি মানদন্ডেই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০-এ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিতায় আছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের ওপর। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ।

আবহমানকাল থেকে এ দেশে ঋতুবৈচিত্র্য বর্তমান। ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের আগমুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর সর্বদিক দিয়ে সংঘটিত এসব পরিবর্তন বাংলাদেশে জলবায়ুগত পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬০ সালে বঙ্গীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ মে তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয় ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, রাজশাহীতে। ১৯৯৫ সালে এসে নথিভুক্ত করা হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল নথিভুক্ত করা হয় বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যশোরে।

তাপমাত্রার এই পরিসংখ্যানে আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হচ্ছে তাপমাত্রা কমছে, কিন্তু বস্তুত অতীতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিল কম অথচ বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি। কেননা, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড-এর গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরেই মে মাসের গড় তাপমাত্রা ১৯৯৫ সালের ওই মাসের তুলনায় বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস? নভেম্বর মাসে এই তাপমাত্রা ১৪ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস? আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ০.৫ শতাংশ। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দিন দিন বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে, সময়মতো হচ্ছে না বন্যা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২৩০০ মিলিমিটার, বরেন্দ্র এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১১৫০ মিলিমিটার। এ রকম স্বল্প বৃষ্টিপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে খরায় আক্রান্ত হবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, যার মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লোকই বেশি। এ রকম খরায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার ব্যাপারে বিভিন্ন উৎস থেকে আলাদা আলাদা উপাত্ত পাওয়া যায়। কারো মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ খরায় উদ্বাস্তু হবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পেয়ে দেখা দিচ্ছে স্থায়ী মরুকরণ। রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। যদিও এরমধ্যে মানবসৃষ্ট কারণ, বিশেষ করে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবও দায়ী। তবে অনাবৃষ্টির দরুন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সুপেয় পানির অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায়ও ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরীগাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। অনেকে একে মানবসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করতে চাইলেও গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। সুন্দরবনের অন্যান্য গাছও আগামরা ও পাতা কঙ্কালকরণ পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে বাইনের বাগানও।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এরমধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধসের মাত্রা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে দু-তিন বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে? এমনকি ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানা রকম প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে বাংলাদেশে। অনেক প্রজাতিই হারিয়ে যেতে বসেছে। গাছ, মাছ, পাখি, ফুল, ফল সবকিছুতেই এই প্রভাব পড়ছে। ইউনেসকোর ‘জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসে পরিবেশের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতের ওপরও পড়ছে বড় প্রভাব। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক আচরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। মৌসুমি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাছের প্রজননে নানাবিধ সমস্যা হচ্ছে, যেমন প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় এবং তাপমাত্রা বেশি থাকায় মাছ কৃত্রিম প্রজননে সাড়া না দেওয়ায় প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য ডিম শরীরে শোষিত হয়ে যাচ্ছে।

সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধিতে হারিয়ে যাবে বা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে দেশের বিপুল পরিমাণ জীবজন্তু। সমুদ্রের লোনাজলের উচ্চতা বাড়লে খুলনার সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণোপযোগী বনভূমি কমে যাবে। এতে বাঘের শিকার কমে যাবে। ফলে স্বভাবতই বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। গাঙ্গে বিচরণকারী শুশুক কমে যাবে। মায়া হরিণ চিরতরে হারিয়ে যাবে। চিত্রা হরিণও কমে যাবে। শঙ্খচূড় সাপ কমে যাবে। মাস্কড কিনফুট একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে। পলাশ ফিস ঈগলও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে কীটপতঙ্গ, যেমন মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কীটপতঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিল যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছিল ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু, সেখানে দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় উপকূলীয় বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে মাটির নিচের লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে বা পাশের দিকে প্রবাহিত হওয়ার মতো নানাবিধ সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশনির্ভর উপজীবীরা তাদের জীবিকা হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বে। এতে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে। যেমন মাছের উৎপাদন কমে গেলে স্বাদুপানির মৎস্যজীবী, সমুদ্রগামী জেলে, উপকূলীয় জেলে ও তাদের পরিবারগুলো জীবিকার উৎস হারাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত মৃত্যু কিংবা তীব্র ঠান্ডাজনিত মৃত্যু ইত্যাদি এখন খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমন্ডলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা। উপকূলীয় এলাকায় বর্ধিত হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এসব আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিচ্ছে নিকটবর্তী বড় শহরগুলোয় কিংবা রাজধানী শহরে। ফলে বাড়ছে সেসব শহরের জনসংখ্যা। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে সেসব শহর হিমশিম খাচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য আয়ের অতিরিক্ত উৎস তৈরি না হওয়ায় উদ্বাস্তু মানুষ বেছে নেয় নানা অপকর্মের পথ। সমাজে দেখা দিতে শুরু করে বিশৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার সম্ভাবনাও দেখা দেয়।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাবনা কতটা?

প্রকাশের সময় : ০১:৪২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৫

সারা বিশ্ব জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশেও এরনেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কি না, তা চারটি মানদন্ডে বিবেচনা করা হয় ১. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২. কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে ৩. সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ৪. ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

বাংলাদেশে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক বেশি। তাই উল্লিখিত চারটি মানদন্ডেই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০-এ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিতায় আছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের ওপর। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ।

আবহমানকাল থেকে এ দেশে ঋতুবৈচিত্র্য বর্তমান। ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের আগমুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর সর্বদিক দিয়ে সংঘটিত এসব পরিবর্তন বাংলাদেশে জলবায়ুগত পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬০ সালে বঙ্গীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ মে তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয় ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, রাজশাহীতে। ১৯৯৫ সালে এসে নথিভুক্ত করা হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল নথিভুক্ত করা হয় বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যশোরে।

তাপমাত্রার এই পরিসংখ্যানে আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হচ্ছে তাপমাত্রা কমছে, কিন্তু বস্তুত অতীতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিল কম অথচ বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি। কেননা, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড-এর গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরেই মে মাসের গড় তাপমাত্রা ১৯৯৫ সালের ওই মাসের তুলনায় বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস? নভেম্বর মাসে এই তাপমাত্রা ১৪ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস? আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ০.৫ শতাংশ। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দিন দিন বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে, সময়মতো হচ্ছে না বন্যা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২৩০০ মিলিমিটার, বরেন্দ্র এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১১৫০ মিলিমিটার। এ রকম স্বল্প বৃষ্টিপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে খরায় আক্রান্ত হবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, যার মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লোকই বেশি। এ রকম খরায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার ব্যাপারে বিভিন্ন উৎস থেকে আলাদা আলাদা উপাত্ত পাওয়া যায়। কারো মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ খরায় উদ্বাস্তু হবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পেয়ে দেখা দিচ্ছে স্থায়ী মরুকরণ। রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। যদিও এরমধ্যে মানবসৃষ্ট কারণ, বিশেষ করে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবও দায়ী। তবে অনাবৃষ্টির দরুন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সুপেয় পানির অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায়ও ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরীগাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। অনেকে একে মানবসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করতে চাইলেও গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। সুন্দরবনের অন্যান্য গাছও আগামরা ও পাতা কঙ্কালকরণ পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে বাইনের বাগানও।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এরমধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধসের মাত্রা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে দু-তিন বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে? এমনকি ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানা রকম প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে বাংলাদেশে। অনেক প্রজাতিই হারিয়ে যেতে বসেছে। গাছ, মাছ, পাখি, ফুল, ফল সবকিছুতেই এই প্রভাব পড়ছে। ইউনেসকোর ‘জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসে পরিবেশের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতের ওপরও পড়ছে বড় প্রভাব। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক আচরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। মৌসুমি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাছের প্রজননে নানাবিধ সমস্যা হচ্ছে, যেমন প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় এবং তাপমাত্রা বেশি থাকায় মাছ কৃত্রিম প্রজননে সাড়া না দেওয়ায় প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য ডিম শরীরে শোষিত হয়ে যাচ্ছে।

সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধিতে হারিয়ে যাবে বা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে দেশের বিপুল পরিমাণ জীবজন্তু। সমুদ্রের লোনাজলের উচ্চতা বাড়লে খুলনার সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণোপযোগী বনভূমি কমে যাবে। এতে বাঘের শিকার কমে যাবে। ফলে স্বভাবতই বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। গাঙ্গে বিচরণকারী শুশুক কমে যাবে। মায়া হরিণ চিরতরে হারিয়ে যাবে। চিত্রা হরিণও কমে যাবে। শঙ্খচূড় সাপ কমে যাবে। মাস্কড কিনফুট একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে। পলাশ ফিস ঈগলও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে কীটপতঙ্গ, যেমন মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কীটপতঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিল যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছিল ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু, সেখানে দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় উপকূলীয় বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে মাটির নিচের লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে বা পাশের দিকে প্রবাহিত হওয়ার মতো নানাবিধ সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশনির্ভর উপজীবীরা তাদের জীবিকা হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বে। এতে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে। যেমন মাছের উৎপাদন কমে গেলে স্বাদুপানির মৎস্যজীবী, সমুদ্রগামী জেলে, উপকূলীয় জেলে ও তাদের পরিবারগুলো জীবিকার উৎস হারাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত মৃত্যু কিংবা তীব্র ঠান্ডাজনিত মৃত্যু ইত্যাদি এখন খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমন্ডলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা। উপকূলীয় এলাকায় বর্ধিত হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এসব আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিচ্ছে নিকটবর্তী বড় শহরগুলোয় কিংবা রাজধানী শহরে। ফলে বাড়ছে সেসব শহরের জনসংখ্যা। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে সেসব শহর হিমশিম খাচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য আয়ের অতিরিক্ত উৎস তৈরি না হওয়ায় উদ্বাস্তু মানুষ বেছে নেয় নানা অপকর্মের পথ। সমাজে দেখা দিতে শুরু করে বিশৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার সম্ভাবনাও দেখা দেয়।