Dhaka 12:41 am, Friday, 9 December 2022

ঘুরে এলাম মেঘ পাহাড়ের দেশ সাজেক

সংবাদদাতা-
  • প্রকাশের সময় : 09:37:13 pm, Tuesday, 23 October 2018
  • / 2084 জন সংবাদটি পড়েছেন

সৌমিত্র শীল ॥
যাত্রাকালেই বিপত্তিঃ
২৬ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় যখন কাজ শেষ করে রওনা হব তখন ঝুম বৃষ্টি। এর মধ্যেই রওনা হলাম। সাথে কল্লোল। কিন্তু অনিবার্য কারণে কোনো গাড়ি ছিলনা রাস্তায়। দুজনে বৃষ্টিতে ভিজে বহু অপেক্ষার পর একটি অটো ভাড়া করে গোয়ালন্দ মোড়। ঢাকা যখন পৌছালাম তখন রাত ১০টা পেরিয়ে গেছে। সেখানে ফারুক সস্ত্রীক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কলাবাগান থেকে খাগড়াছড়ির বাস ছাড়লো ১১ টায়। রাত ২টার দিকে কুমিল্লার জমজমে যাত্রাবিরতি। রেস্তোরা, ক্যান্টিন মিলিয়ে বেশ দর্শণীয় স্থানটি। ভেতরে ঢুকে একটি হাফ লিটার পানি নিলাম ও এক কাপ চা খেলাম। ৬০ টাকার বিল ধরিয়ে দিল হাতে। কোনটার দাম যে কত? তা এখনও ঠাহর করতে পারিনি। যাত্রাবিরতি শেষে বাস এগিয়ে চলছে। ঘুম আসছে না। আমি বসেছিলাম একদম সামনের সিটে। ভ্রমণটা বেশ লাগছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পার হবার পর অবাক বিস্ময়ে বাস চালানো দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন মোবাইলে গেমস খেলছে। উঁচু নীচু আঁকা বাকা রাস্তা দেখেছি। তাই বলে এমন। এটা আসলে লিখে বোঝানো দুস্কর। প্রতিটা বাঁক ১৫০ থেকে ১৮০ ডিগ্রী পর্যন্ত। ঘন ঘন বাঁক। এর মধ্যেই চালক বাস চালাচ্ছিলেন ৯০ কিলোমিটার গতিতে। নিজের কৌতুহল সংবরণ করতে পারিনি। আমি শুধু দেখছিলাম চালকের অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতা। অচেনা কোনো চালকে ওই রাস্তায় গাড়ি চালাতে দিলে নির্ঘাত দুর্ঘটনা ঘটবে সন্দেহ নেই। এভাবে বাস চালানো দেখে আমার মাথা ভিমরী খেয়ে গেল। খাগড়াছড়ি পৌছালাম ভোর ৫টায়। ইজোড় নামক একটি রেস্তোরায় বিশ্রাম ও নাস্তা সেরে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রওনা হলাম চান্দের গাড়িতে করে সাজেকের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে দেখছিলাম প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য। আঁকা বাকা আর বন্ধুর পথ তবুও কত সুন্দর চারপাশের দৃশ্য। সকাল সাড়ে ১০টায় আমরা বাঘারহাট আর্মি ক্যাম্পে পৌছালাম। সেখানকার নিয়ম কানুন শেষ করে আর্মি স্কড সহ সাজেক পৌছালাম যখন তখন দুপুর প্রায় ১টা। ছিম্বাল রেস্টুরেন্টে ব্যাগ রেখে সবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছি। রোদ চশমা পরা সুন্দরী এক তরুণী এসে জিজ্ঞেস করলো; ভাই মনটানা কোথায়? আমি হকচকিয়ে উত্তর দিলাম, কে আবার কার মন টানাটানি করছে? তরুণীর উত্তর; রিসোর্টের নাম মনটানা। আমি বললাম, আমি আপনাদের মতই সবে এসে দাঁড়িয়েছি।
ঝিঁঝিঁ পোকার বাড়ি।
আপাতত আমাদের নিবাসস্থল। বাঁশ দিয়ে তৈরি দোতলা রিসোর্ট। সাধারণতঃ একতলা থেকে দোতলায় উঠতে হয়। তবে এটি আলাদা। দোতলা থেকে নামতে হয় একতলায়। চার কক্ষ বিশিষ্ট রিসোর্টের প্রতিটি কক্ষই পরিপাটি করে সাজানো। প্রতি কক্ষে দুটি করে বিছানা। বাঁশের শৈল্পিক ব্যবহার মুগ্ধ করার মতোই। পেছনে সবুজে ঘেরা পাহাড় আরও বৈচিত্রময়। যত দেখি ততই ভাল লাগে। রিসার্টের নীচের একটি কক্ষে আমি আর কল্লোল। উপরে ফারুক-মিল্কী এবং জাহিদ-¯িœগ্ধা দম্পতি। জাহিদ ফারুকের বন্ধু। জাহিদ ও ¯িœগ্ধা দুজনেই ব্যাংকার। দুজনের সমন্বয়টা চমৎকার। আমাদের রিসোর্টের সামনেই ১০ ফুট উঁচু এক খন্ড পাথর। আমার কাছে ওটাকে কৃত্রিম মনে হওয়ায় ফারুকের এ নিয়ে কী খুঁনসুটি। (প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখা হয়নি বলে আমার মনে এ সন্দেহ ছিল)। ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলের অর্ধেকটা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘুম থেকে উঠে ঘুরতে বেরুলাম।
আমরা যেখানে অবস্থান নিয়েছি। জায়গাটির নাম রুইলুই পাড়া। সাজেক সেখান থেকে ১ কিলোমিটার দূরে। হেঁটে আমরা সাজেক পৌছালাম। রুইলুই পাড়া থেকে সাজেক পর্যন্ত রাস্তার দু পাশ দিয়ে শুধু রিসোর্ট। কিছু দোকানপাটও আছে। রিসোর্টের নামগুলোও বেশ মনোরম। দুর্ভাগ্য আমার নামগুলো মনে রাখতে পারিনি। হেলিপ্যাডে বেশ খানিক ঘোরা ফেরার পর সন্ধ্যায় ফিরলাম আমরা। ছিম্বাল রেস্টেুরেন্টের জন্মদিন উপলক্ষে গান, বাজনা, বাজি ফোটানো, হালকা খাওয়া দাওয়া সবকিছুই হলো। ভাবলাম, রুমে গিয়ে আর একটু ঘুমিয়ে ১০টা সাড়ে ১০টার দিকে রাতের খাবার খাবো।
কল্লোল আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার পর ওকে বলছি; তুমি যাও আমি আর একটু পরে খাবো। কল্লোল বললো, রাতের খাবারের সময় আপনাকে ডেকেছিলাম। আপনি ওঠেননি। এখন ভোর। আমরা হাঁটতে বের হবো। বরাবরই আমি ঘুমকাতুরে। এবার ঘুমিয়ে রাতের খাবারটাই খাওয়া হলোনা।
২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে হাঁটতে বেরিয়েছি মেঘ দেখার জন্য। পাহাড় ঢেকে আছে সাদা রংয়ে আচ্ছন্ন হয়ে। ভাবলাম, ওটাই মেঘ। কাছ থেকে মেঘ দেখার সৌভাগ্যটা হলো ভেবে মন পুলকিত হয়ে উঠলো। মনে সন্দেহও ছিল কুয়াশা নয়তো। পাহাড়ী একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তর শুনে মন খারাপ হলো। ওটা কুয়াশা, মেঘ নয়। মেঘ কখন হবে? এ প্রশ্নের উত্তর পাহাড়ীর জানা নেই। এরপর মেঘ দেখার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। কখনও অল্প একটু মেঘ ভেসে ওঠে। আবার উধাও হয়ে যায়। যেন আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। রোদ উঠে গেছে। পাহাড় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর মেঘ দেখার সম্ভাবনা নেই। আজ বিকেলে বাংলাদেশের খেলা আছে। এশিয়া কাপ ফাইনাল। কিন্তু এ এলাকায় খেলা দেখার সুযোগ কোথায়? আমাদের সাথে আমার মত খেলা পাগল আর একজন আছে। জাহিদ। সন্ধ্যায় খেলা দেখার জন্য এখানে ওখানে ঘুরছি। ফারুককে বলছি, ইন্টারনেটে ব্যবস্থা করো। শেষমেষ একটি বাড়িতে দেখলাম; টিভিতে খেলা চলছে। আমি জাহিদ আর ফারুক ঢুকে পড়লাম। কী দারুন শুরু বাংলাদেশের। পাহাড়, প্রকৃতি আর সবুজের মতই সুন্দর লাগছিল বাংলাদেশের খেলা। জানিনা রড ঠাকরের (টাকার) কী হয়েছিল সেদিন? লিটনকে ওভাবে আউট দেয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলাম না। প্রথম ইনিংস দেখলাম। দ্বিতীয় ইনিংস দেখা হলো না। টিভি অফ। মোবাইলে শুধু স্কোর দেখছিলাম। ২২২ রান তবুও আশা ছাড়িনি। যাহোক শেষ পর্যন্ত খেলার ফলতো সকলেরই জানা।
২৯সেপ্টেম্বরঃ সকাল ৭টার আগেই উঠেছি। ফারুক ও জাহিদ দম্পতি অবশ্য আমাদের আগে বেরিয়ে গেছে। আমি আর কল্লোলও বেরুলাম। এবার মিলল বহু কাক্সিক্ষত মেঘের দেখা। মেঘ আমাদের ছুঁয়ে গেল। মেঘকে ধরার চেষ্টাও করলাম। কী অসাধারণ অনুভূতি। একবার নয়, বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। মেঘ পাহাড়কে ঢেকে ফেলেছে। সবুজে ঘেরা পাহাড় সুন্দর নাকি মেঘে ঢাকা পাহাড় সুন্দর এটা নিয়ে একটা বিতর্ক চলতে পারে।
সকালের নাস্তা করছি ছিম্বালে। ছিম্বালের অংশীদারদের একজন কল্লোল ভাই। কাকতালীয়ভাবে আমাদের কল্লোলের সাথে নামটা মিলে গেছে। শশ্রুমন্ডিত দীর্ঘকায় মানুষটা দারুন। একজন তাকে জিজ্ঞেস করলো? অন্যান্য রেস্টুরেন্টের চেয়ে আপনাদের এখানে ভীর বেশি। কারণ কী? কল্লোল ভাইয়ের উত্তর, আমরা সবাইকে অতিথি ভাবি। তাদের ভালো মন্দ বোঝার চেষ্টা করি। খারাপ কিছু বললেও সয়ে নিই। অতিথির মধ্যে তো ভাল মন্দ থাকেই। সেদিন আমার হাঁটুর বয়সী একটা ছেলে আমাকে বলছে; ‘মামা এক গ্লাস পানি দাও তো। মামাটাতেই একটু আপত্তি। আর সব ঠিক আছে।’
কংলাক, হাজাছড়া ঝর্ণ, রিস্যাং ঝর্ণা ও আলুটিলা গুহা যাত্রাঃ
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭২০ ফুট উঁচুতে আছি আমরা। তবে এতোটা উঁচুতে উঠেছি কিন্তু চান্দের গাড়িতে করে। এবার সত্যিকারের পাহাড়ে চড়বো। কংলাক পাহাড়। যেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে। এখন আমরা কংলাকে যাত্রা করি। আমরা যেখানে অবস্থান করছি মানে রুইলুই পাড়া থেকে কংলাক পাহাড়ের দূরত্ব মাত্র ২ কিলোমিটার। ২৮ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে আমরা চান্দের গাড়িতে রওনা হলাম কংলাকের উদ্দেশ্যে। আমাদের সাথে আছে অনেকেই ২৩ জনের মত। ১০ মিনিটেই পৌছে গেলাম কংলাক। ছোট ছোট পাহাড়ী ছেলেমেয়েরা ৩ ফুট লম্বা লাঠি বিক্রি করছে ১০ টাকা করে। লাঠির উপর ভর করে নাকি পাহাড়ে উঠতে হয়। একটি লাঠি কিনে নিলম। উঠতে শুরু করলাম পাহাড়ে। হাতে লাঠি। ভাবলাম, লাঠিবিহীন স্বাভাবিকভাবেই উঠার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, পেরেছি। পাহাড়ে উঠতে কোন সমস্যা হয়নি। অনেস্টলি বলছি, অনেককে দেখেছি হাঁপাতে। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো আমি এর চেয়ে আরও অনেক উপরে উঠতে পারবো। সবাইতো যে যার মতো চলে গেলো। আমি চলে গেলাম একেবারে চূড়ায়। সেখানে একটি দোকান আছে। প্রথামত পাহাড়ী মেয়েরাই ওই দোকান পরিচালনা করে। ‘ফু ফু’ করছে এক পাহাড়ী। পরে জানা গেল, আমরা যেটিকে আখ বা কুসুর বলি। ওরা বলে ফু। কিছুক্ষণ চূড়ায় থেকে নীচে নেমে এলাম। পাহাড়ের উপরই গড়ে উঠেছে বসতঘর। এখানে মানুষ কীভাবে জীবনযপন করে তা এক বিস্ময়! চূড়া থেকে নীচে নামতে আর একটি দোকান। পাহাড়ী ফলমূল সহ নানান তৈজসপত্র বিক্রি হয় এখানে। ফারুক দোকানী তরুণীকে জিজ্ঞেস করলো এটা কী? তরুণীর উত্তর; ফিফটিন টাকা। কয়েকজন কলা, পেয়ারা খেয়ে দাম দিতে যাবে তখই বিপত্তি। মেয়েটি বাংলা কিছুই বোঝে না। অনেক কষ্টে বোঝানো গেল আমরা দাম দিতে চাইছি। তরুণীর উত্তর থারটি ওয়ান টাকা। সবাই চলে যাবার পর আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম। এটা কি তোমাদের বাড়ি? তরুণীর উত্তর শুনে আমি হতাশ। ‘বড় ভাই, ….কার যেন নামও বলল’। এছাড়া আর কিছুই বলতে পারেনা। এই ধরনের উত্তর কেউ কখনও শুনেছেন বলে মনে হয়না। কংলাক পাহাড়ের উপর দুটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। বিশ্রামের জন্য রিসোর্টটিতে আমরা যেতেই প্রতিবেশি আলম ভাইকে দেখে আমি থ। বিদেশে বিভূইয়ে প্রতিবেশি কাউকে পেলে কী আনন্দ হয় বুঝতে পেরেছিলাম। হ্যাঁ আলম ভাইয়ের রিসোর্ট ওটা। আলম ভাই একসময় নাটক করতেন। রাজবাড়ী সরকারি কলেজের নাট্য সম্পাদক ছিলেন। পাহাড় থেকে ফিরলাম দুপুরে।
২৯ তারিখ সকাল সাড়ে ১০টায় আমরা সাজেককে বিদায় জানালাম। আবার আর্মি এসকর্ট সহ ফিরছি চান্দের গাড়িতে। আমরা এবার যাবো হাজাছড়া ঝর্ণায়। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট এলাকায় অবস্থিত এটি। মূল রাস্তা থেকে হাঁটতে হয় ১৫ মিনিট। আমাদের সাথে গাইড হিসেবে আছেন ইফতিয়ার। বয়সে তরুণ অথচ মুখভর্তি দাঁড়ি মাঝে মাঝেই অট্টহাসি দিয়ে বসেন। কল্লোল, ফারুক দম্পতি, জাহিদ দম্পতি সহ সম্ভবত ১০ জন ছিলাম আমরা। হাজাছড়ায় পৌছালাম। পাহাড়ের উপর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমার আর তর সইছে না। নেমে পড়লাম ঝর্ণায় গোসল করতে। অসাধারণ হিম শীতল পানি। পানির গতির কথা বলি; জাহিদ বললো, দাদা পিঠ ম্যাসাজ করাবেন? আমি বললাম কীভাবে? যান ঝর্ণার নীচে গিয়ে পিঠ পেতে দিন। আমি তাই করলাম। উঁ! কী দারুনযে লাগলো। আমার গোসল প্রায় শেষ পর্যায়ে। কালো জামা পরা মধ্যবয়সী এক লোককে গিয়ে বললাম, ভাই ৪৫ মিনিট ধরে দেখছি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন? ভদ্রলোকের উত্তর; আপনার কোন সমস্যা? আমি বললাম, আমার সমস্যা না, আপনার সমস্যা হবে। সিলিস্যা হয়ে যাবে। সিলিস্যার মানে বুঝলেন কীনা জানিনা। তবে এরপরেই ঝর্ণা থেকে চলে গেলেন লোকটি।
ভেজা কাপড়ে ফিরে আসছি সবাই। অনেক মানুষ যাচ্ছে আসছে। মাঝপথে গিয়ে দেখলাম ৪/৫ জন তরুণ তরুণী ঝর্ণায় যাচ্ছে। আমি নিজ থেকেই বললাম, ঝর্ণায় পানি নেই। এক তরুণী বলে উঠলো একটুও নেই। আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম, নাহ্। আমাদের গাইড ইফতি তার স্বভাবসুলভ অট্টহাসি দিয়ে বললো; এভাবে ওদেরক হতাশ করে দিলেন। আমি বললাম, ওরা ঝর্ণায় যাবে। গিয়ে যখন দেখবে অনেক পানি। আমাকে হয়তো মনে মনে গালি দেবে। খুশীটাও সাধারণের থেকে বেশি হবে।
ইজোড়ে ফিরে লাঞ্চ সেরেই আমরা রওনা হলাম রিছাং এর উদ্দেশ্যে। এই ঝর্ণাটি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা গ্রামে অবস্থিত। শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। আমাদের গাড়ি যেখানে থেমেছে তার থেকেও অনেক নীচে নেমেছি। সেখানে নামার পর নীচে তাকিয়ে কিছু মানুষকে দেখা যাচ্ছে। মানুষগুলোকে লিলিপুট মনে হচ্ছে। কিন্তু ঝর্ণাটি কেমন বোঝার উপায় নেই। তার মানে এ ঝর্ণায় যেতে হলে আরও নীচে নামতে হবে। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম; আমরা চারজন (ফারুক, কল্লোল, জাহিদ ও আমি) যাবো। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছিলাম। সিঁিড়টুকু তো ভালই। রাস্তার বর্ণনা দেয়া কঠিন। ঝর্ণায় পৌছালাম আমরা। জাহিদ, ফারুক, কল্লোল আবারও গোসল করল। আমি আর করলাম না। ঝর্ণায় যারা গোসলা করছিল অনেকেই গড়িয়ে নীচে পড়ে যেন খুব মজা পাচ্ছিল। ঝর্ণাটির বৈশিষ্ট্য হলো এটি পাহাড়ের ১শ ফুট উঁচু থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। একটু পরে মিল্কি ও ¯িœগ্ধাও চলে এলো ঝর্ণায়। এখানে আর দেরি করার সুযোগ নেই। আমাদেরকে আলুটিলা গুহায় যেতে হবে। সন্ধ্যায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার মূল শহর হতে ৭ কিলোমিটার দূরে আরবারী পাহাড়ে অবস্থিত আলুটিলা গুহা।বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমরা আলুটিলা গুহায় পৌছালাম। টিকিট কেটে মশাল নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। গাইড ইফতি সে ব্যবস্থা করলেন। মশাল জ্বালিয়ে আমরা গুহায় প্রবেশ করেছি। আমাদের সাথে ঢাকার এক দম্পতি ছিলো (নাম মনে করতে পারছিনা)। এমন সজ্জন ভদ্রলোক খুব কমই মেলে। তারাও ঢুকলো গুহায়। কিছুদূর গিয়ে ভদ্রমহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। তার ভয় করছে। আর যাবেন না। আমি বললাম, ভয় করলে না যাওয়াই ভালো। ফিরে যান। তারা ফিরে গেল। এই গুহাটি যেমন অন্ধকার তেমনই ঠান্ডা। কোন প্রকার সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। সুড়ঙ্গের তলদেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে ও এর তলদেশ দিয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা। কোথাও কোথাও আবার এতটাই নীচু যে আমাদেরকে মাথা নীচু করে যেতে হয়েছে। গুহা থেকে বের হতে আমাদের ১০ মিনিটের বেশি সময় লেগেছিল। পাহাড়ে উঠে যতটা ভালো লেগেছে, ঝর্ণায় গোসল করে যতটা মজা পেয়েছি। ১০ মিনিটের গুহা ভ্রমণ তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দময় মনে হয়েছে। দারুন অ্যডভেঞ্চার।
শরীরটা কিঞ্চিৎ ব্যথা হয়েছে। জ্বর আসবে নাকি? সবে সন্ধ্যা। আমাদের ফিরতি বাস সাড়ে ৯টায়। ব্যথা আর জ্বর জ্বর শরীর নিয়ে একাই খাগড়াছড়ি শহর হেঁটে বেড়ালাম। উদ্দেশ্য অবশ্য একটা ছিল সগোত্রিয়দের সাথে একটু আলাপচারিতা। প্রেসক্লাব খুঁজে পেলেও সেটি ছিল তালাবদ্ধ। কারও নাম্বারও ছিল না যোগাযোগ করার। খাগড়াছড়ি শহরটা মন্দ নয়। অফিস কাচারী সব একই জায়গা দিয়ে। রাস্তার দুপাশে দোকানপাট। গার্মেন্ট আর কাপড় চোপড়ের দোকানগুলোতে অল্প বয়সী তরুণীরা দোকানদারি করছে। শহর ঘুরে ফিরে এলাম ইজরে। আটটা বেজে গেছে। রাতের খাবার খেতে বসলাম। কী দিয়ে খাবো। ডাল আলু ভর্তা আর ডিম দিয়ে ভাত খেলুম। দুপুরে ডিম ছিলনা। দিয়েছিল লইট্টা মাছ। মাছের ভেতর দিয়ে দুটি কাঠি ঢুকিয়ে ফ্রাই করা। খেতে নাকি খুব মজার। আমার কাছে ভাল লাগেনি। সমস্যাটা আমারই। অচেনা খাবার খেতে পারিনা। জ্বর জ্বর বোধ হওয়ায় পুরো একটা লেবু চিপে পানিতে লবণ মিশিয়ে খেয়ে দিলাম। গলাও অবশ্য ভেঙে গেছে। কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে। বাড়ি পর্যন্ত ফিরতে পারলেই হবে। এক কেজি মাল্টা কিনে নিলাম। এখানে মাল্টা খুব সস্তা। মাত্র ৪০ টাকা কেজি। প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। আমি, ফারুক, মিল্কী, কল্লোল সহ আমাদের সাথে অন্যরা উঠে পড়েছি এক বাসে। জাহিদ ¯িœগ্ধা উঠেছে অন্য বাসে। ওরা নামবে ঢাকাতেই। বিদায় জানাতে খুঁজছিলাম ওদর। পাইনি। ১০টার দিকে বাস ছাড়ল। ঘুমিয়ে পড়লাম বাসের মধ্যে। কুমিল্লার জমজম মোটেলে গিয়ে বাস থামল। ২০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। আমার গলার অবস্থা খারাপ। কথা বের হচ্ছে না। চা খাওয়া দরকার। ৩ জায়গায় খুঁজলাম, পেলাম না। একজন দেখিয়ে দিল ভেতরে যান পাবেন। চা টা খেতে পেরে কী যে ভাল লাগল! দাম ১৫ টাকা নিয়ছে তাতে অসুবিধে নেই।
২০ মিনিটের বিরতি শেষে বাস ছেড়ে দিল। দারুন সময়ে আমরা ঢাকা পৌছালাম। ভোর ৫টা। গাবতলী থেকে রাজবাড়ী আসতে আর অসুবিধে হয়নি। ৩০সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার মধ্যেই পৌছে গেছি প্রিয় শহর রাজবাড়ী। বাঁচা গেছে জ্বর আসেনি। তবে গলার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ঘুরে এলাম মেঘ পাহাড়ের দেশ সাজেক

প্রকাশের সময় : 09:37:13 pm, Tuesday, 23 October 2018

সৌমিত্র শীল ॥
যাত্রাকালেই বিপত্তিঃ
২৬ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় যখন কাজ শেষ করে রওনা হব তখন ঝুম বৃষ্টি। এর মধ্যেই রওনা হলাম। সাথে কল্লোল। কিন্তু অনিবার্য কারণে কোনো গাড়ি ছিলনা রাস্তায়। দুজনে বৃষ্টিতে ভিজে বহু অপেক্ষার পর একটি অটো ভাড়া করে গোয়ালন্দ মোড়। ঢাকা যখন পৌছালাম তখন রাত ১০টা পেরিয়ে গেছে। সেখানে ফারুক সস্ত্রীক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কলাবাগান থেকে খাগড়াছড়ির বাস ছাড়লো ১১ টায়। রাত ২টার দিকে কুমিল্লার জমজমে যাত্রাবিরতি। রেস্তোরা, ক্যান্টিন মিলিয়ে বেশ দর্শণীয় স্থানটি। ভেতরে ঢুকে একটি হাফ লিটার পানি নিলাম ও এক কাপ চা খেলাম। ৬০ টাকার বিল ধরিয়ে দিল হাতে। কোনটার দাম যে কত? তা এখনও ঠাহর করতে পারিনি। যাত্রাবিরতি শেষে বাস এগিয়ে চলছে। ঘুম আসছে না। আমি বসেছিলাম একদম সামনের সিটে। ভ্রমণটা বেশ লাগছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পার হবার পর অবাক বিস্ময়ে বাস চালানো দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন মোবাইলে গেমস খেলছে। উঁচু নীচু আঁকা বাকা রাস্তা দেখেছি। তাই বলে এমন। এটা আসলে লিখে বোঝানো দুস্কর। প্রতিটা বাঁক ১৫০ থেকে ১৮০ ডিগ্রী পর্যন্ত। ঘন ঘন বাঁক। এর মধ্যেই চালক বাস চালাচ্ছিলেন ৯০ কিলোমিটার গতিতে। নিজের কৌতুহল সংবরণ করতে পারিনি। আমি শুধু দেখছিলাম চালকের অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতা। অচেনা কোনো চালকে ওই রাস্তায় গাড়ি চালাতে দিলে নির্ঘাত দুর্ঘটনা ঘটবে সন্দেহ নেই। এভাবে বাস চালানো দেখে আমার মাথা ভিমরী খেয়ে গেল। খাগড়াছড়ি পৌছালাম ভোর ৫টায়। ইজোড় নামক একটি রেস্তোরায় বিশ্রাম ও নাস্তা সেরে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রওনা হলাম চান্দের গাড়িতে করে সাজেকের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে দেখছিলাম প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য। আঁকা বাকা আর বন্ধুর পথ তবুও কত সুন্দর চারপাশের দৃশ্য। সকাল সাড়ে ১০টায় আমরা বাঘারহাট আর্মি ক্যাম্পে পৌছালাম। সেখানকার নিয়ম কানুন শেষ করে আর্মি স্কড সহ সাজেক পৌছালাম যখন তখন দুপুর প্রায় ১টা। ছিম্বাল রেস্টুরেন্টে ব্যাগ রেখে সবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছি। রোদ চশমা পরা সুন্দরী এক তরুণী এসে জিজ্ঞেস করলো; ভাই মনটানা কোথায়? আমি হকচকিয়ে উত্তর দিলাম, কে আবার কার মন টানাটানি করছে? তরুণীর উত্তর; রিসোর্টের নাম মনটানা। আমি বললাম, আমি আপনাদের মতই সবে এসে দাঁড়িয়েছি।
ঝিঁঝিঁ পোকার বাড়ি।
আপাতত আমাদের নিবাসস্থল। বাঁশ দিয়ে তৈরি দোতলা রিসোর্ট। সাধারণতঃ একতলা থেকে দোতলায় উঠতে হয়। তবে এটি আলাদা। দোতলা থেকে নামতে হয় একতলায়। চার কক্ষ বিশিষ্ট রিসোর্টের প্রতিটি কক্ষই পরিপাটি করে সাজানো। প্রতি কক্ষে দুটি করে বিছানা। বাঁশের শৈল্পিক ব্যবহার মুগ্ধ করার মতোই। পেছনে সবুজে ঘেরা পাহাড় আরও বৈচিত্রময়। যত দেখি ততই ভাল লাগে। রিসার্টের নীচের একটি কক্ষে আমি আর কল্লোল। উপরে ফারুক-মিল্কী এবং জাহিদ-¯িœগ্ধা দম্পতি। জাহিদ ফারুকের বন্ধু। জাহিদ ও ¯িœগ্ধা দুজনেই ব্যাংকার। দুজনের সমন্বয়টা চমৎকার। আমাদের রিসোর্টের সামনেই ১০ ফুট উঁচু এক খন্ড পাথর। আমার কাছে ওটাকে কৃত্রিম মনে হওয়ায় ফারুকের এ নিয়ে কী খুঁনসুটি। (প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখা হয়নি বলে আমার মনে এ সন্দেহ ছিল)। ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলের অর্ধেকটা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘুম থেকে উঠে ঘুরতে বেরুলাম।
আমরা যেখানে অবস্থান নিয়েছি। জায়গাটির নাম রুইলুই পাড়া। সাজেক সেখান থেকে ১ কিলোমিটার দূরে। হেঁটে আমরা সাজেক পৌছালাম। রুইলুই পাড়া থেকে সাজেক পর্যন্ত রাস্তার দু পাশ দিয়ে শুধু রিসোর্ট। কিছু দোকানপাটও আছে। রিসোর্টের নামগুলোও বেশ মনোরম। দুর্ভাগ্য আমার নামগুলো মনে রাখতে পারিনি। হেলিপ্যাডে বেশ খানিক ঘোরা ফেরার পর সন্ধ্যায় ফিরলাম আমরা। ছিম্বাল রেস্টেুরেন্টের জন্মদিন উপলক্ষে গান, বাজনা, বাজি ফোটানো, হালকা খাওয়া দাওয়া সবকিছুই হলো। ভাবলাম, রুমে গিয়ে আর একটু ঘুমিয়ে ১০টা সাড়ে ১০টার দিকে রাতের খাবার খাবো।
কল্লোল আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার পর ওকে বলছি; তুমি যাও আমি আর একটু পরে খাবো। কল্লোল বললো, রাতের খাবারের সময় আপনাকে ডেকেছিলাম। আপনি ওঠেননি। এখন ভোর। আমরা হাঁটতে বের হবো। বরাবরই আমি ঘুমকাতুরে। এবার ঘুমিয়ে রাতের খাবারটাই খাওয়া হলোনা।
২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে হাঁটতে বেরিয়েছি মেঘ দেখার জন্য। পাহাড় ঢেকে আছে সাদা রংয়ে আচ্ছন্ন হয়ে। ভাবলাম, ওটাই মেঘ। কাছ থেকে মেঘ দেখার সৌভাগ্যটা হলো ভেবে মন পুলকিত হয়ে উঠলো। মনে সন্দেহও ছিল কুয়াশা নয়তো। পাহাড়ী একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তর শুনে মন খারাপ হলো। ওটা কুয়াশা, মেঘ নয়। মেঘ কখন হবে? এ প্রশ্নের উত্তর পাহাড়ীর জানা নেই। এরপর মেঘ দেখার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। কখনও অল্প একটু মেঘ ভেসে ওঠে। আবার উধাও হয়ে যায়। যেন আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। রোদ উঠে গেছে। পাহাড় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর মেঘ দেখার সম্ভাবনা নেই। আজ বিকেলে বাংলাদেশের খেলা আছে। এশিয়া কাপ ফাইনাল। কিন্তু এ এলাকায় খেলা দেখার সুযোগ কোথায়? আমাদের সাথে আমার মত খেলা পাগল আর একজন আছে। জাহিদ। সন্ধ্যায় খেলা দেখার জন্য এখানে ওখানে ঘুরছি। ফারুককে বলছি, ইন্টারনেটে ব্যবস্থা করো। শেষমেষ একটি বাড়িতে দেখলাম; টিভিতে খেলা চলছে। আমি জাহিদ আর ফারুক ঢুকে পড়লাম। কী দারুন শুরু বাংলাদেশের। পাহাড়, প্রকৃতি আর সবুজের মতই সুন্দর লাগছিল বাংলাদেশের খেলা। জানিনা রড ঠাকরের (টাকার) কী হয়েছিল সেদিন? লিটনকে ওভাবে আউট দেয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলাম না। প্রথম ইনিংস দেখলাম। দ্বিতীয় ইনিংস দেখা হলো না। টিভি অফ। মোবাইলে শুধু স্কোর দেখছিলাম। ২২২ রান তবুও আশা ছাড়িনি। যাহোক শেষ পর্যন্ত খেলার ফলতো সকলেরই জানা।
২৯সেপ্টেম্বরঃ সকাল ৭টার আগেই উঠেছি। ফারুক ও জাহিদ দম্পতি অবশ্য আমাদের আগে বেরিয়ে গেছে। আমি আর কল্লোলও বেরুলাম। এবার মিলল বহু কাক্সিক্ষত মেঘের দেখা। মেঘ আমাদের ছুঁয়ে গেল। মেঘকে ধরার চেষ্টাও করলাম। কী অসাধারণ অনুভূতি। একবার নয়, বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। মেঘ পাহাড়কে ঢেকে ফেলেছে। সবুজে ঘেরা পাহাড় সুন্দর নাকি মেঘে ঢাকা পাহাড় সুন্দর এটা নিয়ে একটা বিতর্ক চলতে পারে।
সকালের নাস্তা করছি ছিম্বালে। ছিম্বালের অংশীদারদের একজন কল্লোল ভাই। কাকতালীয়ভাবে আমাদের কল্লোলের সাথে নামটা মিলে গেছে। শশ্রুমন্ডিত দীর্ঘকায় মানুষটা দারুন। একজন তাকে জিজ্ঞেস করলো? অন্যান্য রেস্টুরেন্টের চেয়ে আপনাদের এখানে ভীর বেশি। কারণ কী? কল্লোল ভাইয়ের উত্তর, আমরা সবাইকে অতিথি ভাবি। তাদের ভালো মন্দ বোঝার চেষ্টা করি। খারাপ কিছু বললেও সয়ে নিই। অতিথির মধ্যে তো ভাল মন্দ থাকেই। সেদিন আমার হাঁটুর বয়সী একটা ছেলে আমাকে বলছে; ‘মামা এক গ্লাস পানি দাও তো। মামাটাতেই একটু আপত্তি। আর সব ঠিক আছে।’
কংলাক, হাজাছড়া ঝর্ণ, রিস্যাং ঝর্ণা ও আলুটিলা গুহা যাত্রাঃ
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭২০ ফুট উঁচুতে আছি আমরা। তবে এতোটা উঁচুতে উঠেছি কিন্তু চান্দের গাড়িতে করে। এবার সত্যিকারের পাহাড়ে চড়বো। কংলাক পাহাড়। যেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে। এখন আমরা কংলাকে যাত্রা করি। আমরা যেখানে অবস্থান করছি মানে রুইলুই পাড়া থেকে কংলাক পাহাড়ের দূরত্ব মাত্র ২ কিলোমিটার। ২৮ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে আমরা চান্দের গাড়িতে রওনা হলাম কংলাকের উদ্দেশ্যে। আমাদের সাথে আছে অনেকেই ২৩ জনের মত। ১০ মিনিটেই পৌছে গেলাম কংলাক। ছোট ছোট পাহাড়ী ছেলেমেয়েরা ৩ ফুট লম্বা লাঠি বিক্রি করছে ১০ টাকা করে। লাঠির উপর ভর করে নাকি পাহাড়ে উঠতে হয়। একটি লাঠি কিনে নিলম। উঠতে শুরু করলাম পাহাড়ে। হাতে লাঠি। ভাবলাম, লাঠিবিহীন স্বাভাবিকভাবেই উঠার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, পেরেছি। পাহাড়ে উঠতে কোন সমস্যা হয়নি। অনেস্টলি বলছি, অনেককে দেখেছি হাঁপাতে। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো আমি এর চেয়ে আরও অনেক উপরে উঠতে পারবো। সবাইতো যে যার মতো চলে গেলো। আমি চলে গেলাম একেবারে চূড়ায়। সেখানে একটি দোকান আছে। প্রথামত পাহাড়ী মেয়েরাই ওই দোকান পরিচালনা করে। ‘ফু ফু’ করছে এক পাহাড়ী। পরে জানা গেল, আমরা যেটিকে আখ বা কুসুর বলি। ওরা বলে ফু। কিছুক্ষণ চূড়ায় থেকে নীচে নেমে এলাম। পাহাড়ের উপরই গড়ে উঠেছে বসতঘর। এখানে মানুষ কীভাবে জীবনযপন করে তা এক বিস্ময়! চূড়া থেকে নীচে নামতে আর একটি দোকান। পাহাড়ী ফলমূল সহ নানান তৈজসপত্র বিক্রি হয় এখানে। ফারুক দোকানী তরুণীকে জিজ্ঞেস করলো এটা কী? তরুণীর উত্তর; ফিফটিন টাকা। কয়েকজন কলা, পেয়ারা খেয়ে দাম দিতে যাবে তখই বিপত্তি। মেয়েটি বাংলা কিছুই বোঝে না। অনেক কষ্টে বোঝানো গেল আমরা দাম দিতে চাইছি। তরুণীর উত্তর থারটি ওয়ান টাকা। সবাই চলে যাবার পর আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম। এটা কি তোমাদের বাড়ি? তরুণীর উত্তর শুনে আমি হতাশ। ‘বড় ভাই, ….কার যেন নামও বলল’। এছাড়া আর কিছুই বলতে পারেনা। এই ধরনের উত্তর কেউ কখনও শুনেছেন বলে মনে হয়না। কংলাক পাহাড়ের উপর দুটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। বিশ্রামের জন্য রিসোর্টটিতে আমরা যেতেই প্রতিবেশি আলম ভাইকে দেখে আমি থ। বিদেশে বিভূইয়ে প্রতিবেশি কাউকে পেলে কী আনন্দ হয় বুঝতে পেরেছিলাম। হ্যাঁ আলম ভাইয়ের রিসোর্ট ওটা। আলম ভাই একসময় নাটক করতেন। রাজবাড়ী সরকারি কলেজের নাট্য সম্পাদক ছিলেন। পাহাড় থেকে ফিরলাম দুপুরে।
২৯ তারিখ সকাল সাড়ে ১০টায় আমরা সাজেককে বিদায় জানালাম। আবার আর্মি এসকর্ট সহ ফিরছি চান্দের গাড়িতে। আমরা এবার যাবো হাজাছড়া ঝর্ণায়। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট এলাকায় অবস্থিত এটি। মূল রাস্তা থেকে হাঁটতে হয় ১৫ মিনিট। আমাদের সাথে গাইড হিসেবে আছেন ইফতিয়ার। বয়সে তরুণ অথচ মুখভর্তি দাঁড়ি মাঝে মাঝেই অট্টহাসি দিয়ে বসেন। কল্লোল, ফারুক দম্পতি, জাহিদ দম্পতি সহ সম্ভবত ১০ জন ছিলাম আমরা। হাজাছড়ায় পৌছালাম। পাহাড়ের উপর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমার আর তর সইছে না। নেমে পড়লাম ঝর্ণায় গোসল করতে। অসাধারণ হিম শীতল পানি। পানির গতির কথা বলি; জাহিদ বললো, দাদা পিঠ ম্যাসাজ করাবেন? আমি বললাম কীভাবে? যান ঝর্ণার নীচে গিয়ে পিঠ পেতে দিন। আমি তাই করলাম। উঁ! কী দারুনযে লাগলো। আমার গোসল প্রায় শেষ পর্যায়ে। কালো জামা পরা মধ্যবয়সী এক লোককে গিয়ে বললাম, ভাই ৪৫ মিনিট ধরে দেখছি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন? ভদ্রলোকের উত্তর; আপনার কোন সমস্যা? আমি বললাম, আমার সমস্যা না, আপনার সমস্যা হবে। সিলিস্যা হয়ে যাবে। সিলিস্যার মানে বুঝলেন কীনা জানিনা। তবে এরপরেই ঝর্ণা থেকে চলে গেলেন লোকটি।
ভেজা কাপড়ে ফিরে আসছি সবাই। অনেক মানুষ যাচ্ছে আসছে। মাঝপথে গিয়ে দেখলাম ৪/৫ জন তরুণ তরুণী ঝর্ণায় যাচ্ছে। আমি নিজ থেকেই বললাম, ঝর্ণায় পানি নেই। এক তরুণী বলে উঠলো একটুও নেই। আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম, নাহ্। আমাদের গাইড ইফতি তার স্বভাবসুলভ অট্টহাসি দিয়ে বললো; এভাবে ওদেরক হতাশ করে দিলেন। আমি বললাম, ওরা ঝর্ণায় যাবে। গিয়ে যখন দেখবে অনেক পানি। আমাকে হয়তো মনে মনে গালি দেবে। খুশীটাও সাধারণের থেকে বেশি হবে।
ইজোড়ে ফিরে লাঞ্চ সেরেই আমরা রওনা হলাম রিছাং এর উদ্দেশ্যে। এই ঝর্ণাটি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা গ্রামে অবস্থিত। শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। আমাদের গাড়ি যেখানে থেমেছে তার থেকেও অনেক নীচে নেমেছি। সেখানে নামার পর নীচে তাকিয়ে কিছু মানুষকে দেখা যাচ্ছে। মানুষগুলোকে লিলিপুট মনে হচ্ছে। কিন্তু ঝর্ণাটি কেমন বোঝার উপায় নেই। তার মানে এ ঝর্ণায় যেতে হলে আরও নীচে নামতে হবে। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম; আমরা চারজন (ফারুক, কল্লোল, জাহিদ ও আমি) যাবো। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছিলাম। সিঁিড়টুকু তো ভালই। রাস্তার বর্ণনা দেয়া কঠিন। ঝর্ণায় পৌছালাম আমরা। জাহিদ, ফারুক, কল্লোল আবারও গোসল করল। আমি আর করলাম না। ঝর্ণায় যারা গোসলা করছিল অনেকেই গড়িয়ে নীচে পড়ে যেন খুব মজা পাচ্ছিল। ঝর্ণাটির বৈশিষ্ট্য হলো এটি পাহাড়ের ১শ ফুট উঁচু থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। একটু পরে মিল্কি ও ¯িœগ্ধাও চলে এলো ঝর্ণায়। এখানে আর দেরি করার সুযোগ নেই। আমাদেরকে আলুটিলা গুহায় যেতে হবে। সন্ধ্যায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার মূল শহর হতে ৭ কিলোমিটার দূরে আরবারী পাহাড়ে অবস্থিত আলুটিলা গুহা।বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমরা আলুটিলা গুহায় পৌছালাম। টিকিট কেটে মশাল নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। গাইড ইফতি সে ব্যবস্থা করলেন। মশাল জ্বালিয়ে আমরা গুহায় প্রবেশ করেছি। আমাদের সাথে ঢাকার এক দম্পতি ছিলো (নাম মনে করতে পারছিনা)। এমন সজ্জন ভদ্রলোক খুব কমই মেলে। তারাও ঢুকলো গুহায়। কিছুদূর গিয়ে ভদ্রমহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। তার ভয় করছে। আর যাবেন না। আমি বললাম, ভয় করলে না যাওয়াই ভালো। ফিরে যান। তারা ফিরে গেল। এই গুহাটি যেমন অন্ধকার তেমনই ঠান্ডা। কোন প্রকার সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। সুড়ঙ্গের তলদেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে ও এর তলদেশ দিয়ে বয়ে গেছে ঝর্ণা। কোথাও কোথাও আবার এতটাই নীচু যে আমাদেরকে মাথা নীচু করে যেতে হয়েছে। গুহা থেকে বের হতে আমাদের ১০ মিনিটের বেশি সময় লেগেছিল। পাহাড়ে উঠে যতটা ভালো লেগেছে, ঝর্ণায় গোসল করে যতটা মজা পেয়েছি। ১০ মিনিটের গুহা ভ্রমণ তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দময় মনে হয়েছে। দারুন অ্যডভেঞ্চার।
শরীরটা কিঞ্চিৎ ব্যথা হয়েছে। জ্বর আসবে নাকি? সবে সন্ধ্যা। আমাদের ফিরতি বাস সাড়ে ৯টায়। ব্যথা আর জ্বর জ্বর শরীর নিয়ে একাই খাগড়াছড়ি শহর হেঁটে বেড়ালাম। উদ্দেশ্য অবশ্য একটা ছিল সগোত্রিয়দের সাথে একটু আলাপচারিতা। প্রেসক্লাব খুঁজে পেলেও সেটি ছিল তালাবদ্ধ। কারও নাম্বারও ছিল না যোগাযোগ করার। খাগড়াছড়ি শহরটা মন্দ নয়। অফিস কাচারী সব একই জায়গা দিয়ে। রাস্তার দুপাশে দোকানপাট। গার্মেন্ট আর কাপড় চোপড়ের দোকানগুলোতে অল্প বয়সী তরুণীরা দোকানদারি করছে। শহর ঘুরে ফিরে এলাম ইজরে। আটটা বেজে গেছে। রাতের খাবার খেতে বসলাম। কী দিয়ে খাবো। ডাল আলু ভর্তা আর ডিম দিয়ে ভাত খেলুম। দুপুরে ডিম ছিলনা। দিয়েছিল লইট্টা মাছ। মাছের ভেতর দিয়ে দুটি কাঠি ঢুকিয়ে ফ্রাই করা। খেতে নাকি খুব মজার। আমার কাছে ভাল লাগেনি। সমস্যাটা আমারই। অচেনা খাবার খেতে পারিনা। জ্বর জ্বর বোধ হওয়ায় পুরো একটা লেবু চিপে পানিতে লবণ মিশিয়ে খেয়ে দিলাম। গলাও অবশ্য ভেঙে গেছে। কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে। বাড়ি পর্যন্ত ফিরতে পারলেই হবে। এক কেজি মাল্টা কিনে নিলাম। এখানে মাল্টা খুব সস্তা। মাত্র ৪০ টাকা কেজি। প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। আমি, ফারুক, মিল্কী, কল্লোল সহ আমাদের সাথে অন্যরা উঠে পড়েছি এক বাসে। জাহিদ ¯িœগ্ধা উঠেছে অন্য বাসে। ওরা নামবে ঢাকাতেই। বিদায় জানাতে খুঁজছিলাম ওদর। পাইনি। ১০টার দিকে বাস ছাড়ল। ঘুমিয়ে পড়লাম বাসের মধ্যে। কুমিল্লার জমজম মোটেলে গিয়ে বাস থামল। ২০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। আমার গলার অবস্থা খারাপ। কথা বের হচ্ছে না। চা খাওয়া দরকার। ৩ জায়গায় খুঁজলাম, পেলাম না। একজন দেখিয়ে দিল ভেতরে যান পাবেন। চা টা খেতে পেরে কী যে ভাল লাগল! দাম ১৫ টাকা নিয়ছে তাতে অসুবিধে নেই।
২০ মিনিটের বিরতি শেষে বাস ছেড়ে দিল। দারুন সময়ে আমরা ঢাকা পৌছালাম। ভোর ৫টা। গাবতলী থেকে রাজবাড়ী আসতে আর অসুবিধে হয়নি। ৩০সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার মধ্যেই পৌছে গেছি প্রিয় শহর রাজবাড়ী। বাঁচা গেছে জ্বর আসেনি। তবে গলার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।