হঠাৎ কেন বিটিভির লোগো বদলের সিদ্ধান্ত?
- প্রকাশের সময় : ০৫:০৫:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 10
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) দীর্ঘদিনের পরিচিত লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক লোকসান ও দর্শকসংকট, অন্যদিকে নতুন লোগো তৈরির আহ্বান—বিটিভিকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে জিয়াউর রহমানের সময়ে অনুমোদিত এবং শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের নতুন রূপ দেওয়া ঐতিহ্যবাহী লোগো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৮০ সালে রঙিন সম্প্রচার যুগে প্রবেশের সময় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে নতুন রূপ পাওয়া বিটিভির পরিচিত লোগোটি দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে দর্শকদের কাছে পরিচিত। হঠাৎ সেই লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে।
গত রবিবার রাতে বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নতুন লোগো ডিজাইনের জন্য সবার কাছ থেকে আইডিয়া ও নকশা আহ্বান করা হয়। এতে বলা হয়, আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আগ্রহীরা তাদের লোগো ডিজাইন জমা দিতে পারবেন।
বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন লোগো পরিবর্তনসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।
গত ৭ আগস্ট বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কাজী জেসিন। পরে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বিটিভিকে শুধু আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া নয়, বরং আরও আধুনিক, অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিটিভিকে নতুনভাবে সাজানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারুন।
তিনি বলেন, বর্তমান লোগোটির সঙ্গে শিল্পী কামরুল হাসান, ইমদাদ হোসেন ও মুস্তাফা মনোয়ারের কাজের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে বিটিভির মূল লোগো নির্মাণে ভূমিকা রাখেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন। পরে ১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচার শুরু করলে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সেটিকে নতুন রূপ দেন। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচারের সঙ্গে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই লোগোর উদ্বোধন করেন।
খ ম হারুনের প্রশ্ন, ‘জিয়াউর রহমানের সময়ে অনুমোদিত এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত এই লোগোটি হঠাৎ পরিবর্তন করা কেন জরুরি হয়ে পড়ল?’
তার মতে, লোগো পরিবর্তনের চেয়ে বিটিভির অনুষ্ঠান ও কনটেন্টের মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া বেশি প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা, মেধাবী শিল্পী ও নির্মাতাদের সম্পৃক্ত করা, শূন্য পদ পূরণ, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, দুর্নীতি কমানো এবং শিল্পীদের সম্মানী কাঠামো যুগোপযোগী করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিটিভির আয়-ব্যয়ের চিত্র
বিটিভির আর্থিক অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত করসহ প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান দুই শত কোটি টাকারও বেশি।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরেও বিটিভির ব্যয় আয়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় ছিল ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, ব্যয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ২১ লাখ ২২ হাজার এবং ব্যয় ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩০৭ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা।
ফলে বিটিভির আধুনিকায়ন ও দর্শক ফেরানোর উদ্যোগের মধ্যে নতুন লোগো পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এলেও সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—শুধু লোগো বদলেই কি রাষ্ট্রীয় এই সম্প্রচারমাধ্যমের সংকট কাটবে, নাকি প্রয়োজন অনুষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন?
বর্তমানে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন তাকিয়ে আছেন বিটিভির দর্শক, সংস্কৃতিকর্মী ও সংশ্লিষ্টরা।















