ভাই-বোনের শিকলবন্দী অমানবিক জীবন
- প্রকাশের সময় : ০৩:০০:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫
- / 140
মানসিক ভারসাম্যহীন দুই ভাই-বোনের শিকলবন্দী জীবনই যেন নিয়তি। তারা হলেন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মেঘনা মোল্লাপাড়া গ্রামের ফজাই মোল্লার ছেলে জালাল মোল্লা (৩৫) ও মেয়ে হাজেরা খাতুন (২৭)। জালাল মোল্লা ১০ বছর এবং হাজেরা খাতুন তিন বছর ধরে শিকলবন্দী রয়েছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ফজাই মোল্লা পেশায় একজন কৃষক। তার পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে। জালাল ছেলেদের মধ্যে চতুর্থ। অন্য চারজনের দুজন ঢাকায় এবং দুজন পাংশায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। জালাল মোল্লা কৃষিকাজ করতেন। বছর দশেক আগে হঠাৎ করেই মানসিক ভারসাম্য হারান জালাল। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েছিলেন বাবা-মা। সুস্থ না হওয়ায় নেওয়া হয়েছিল পাবনা মানসিক হাসপাতালে। কিন্তু অর্থাভাবে মাঝপথেই থেমে যায় চিকিৎসা। নিয়ে আসা হয় বাড়িতে। এর কিছু দিন পর জালালের মানসিক সমস্যা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে উগ্রতা। একে ওকে মারধর শুরু করেন। একারণে বাধ্য হয়ে তার পায়ে শেকল পরিয়ে দেওয়া হয়।
তিন বছর আগে মরার উপর খড়ার ঘায়ের মত ঘটে আরেক ঘটনা। জালালের বোন হাজেরা খাতুনের একমাত্র ছেলে পানিতে ডুবে মারা যায়। সন্তানের শোক সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য্য হারান হাজেরাও। একারণে শ^শুর বাড়ি থেকে তাকে আর ফিরিয়ে নেয়নি। তার চিকিৎসা শুরু করে মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায় অর্থাভাবে। মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর হাজেরা খাতুন বেশ কয়েকবার বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। তাকে খুঁজে আনতে হয়েছে। সে যেন বাড়ির বাইরে যেতে না পারে এজন্য তার পায়েও শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার ফজাই মোল্লার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ঘরে শুয়ে আছেন জালাল। তার পায়ে শেকল তালা দেওয়া। শেকলটি একটু লম্বা। যাতে একটু ঘোরাঘুরি করতে পারেন। হাজেরা শেকল পায়ে বাড়ির বারান্দায় পায়চারী করছিল। তার হাত-পা কাঁপছিল।
জালাল ও হাজেরার মা আকিরন বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তার ছেলে মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর পাবনায় চিকিৎসা করানো হয়। তিন মাস সেখানে ভর্তি ছিল। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। কুষ্টিয়ার এক চিকিৎসকের কাছেও নেওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু লাভ কিছু হয়নি। তিন বছর আগে তার মেয়েও মানসিক ভারসাম্য হারায়। মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর আমার ছেলে-মেয়ে দুজনই মাঝে মাঝে আমাকে খুব মারধর করেছে। শরীর জুড়ে কত আঘাত সইতে হয়েছে। তা কাউকে বলা যায় না। তবুও তারা তো আমার সন্তান। তাদের ফেলে আমি কোথায় যাব বলুন। আমি রান্না করে ওদের জন্য ঘরে খাবার রেখে দিই। যখন ইচ্ছা হয়, তখন তারা খেয়ে নেয়। তারা ক্ষুধায় কষ্ট পাবে এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। এখন বৃদ্ধ বয়সে আর পেরে উঠছেন না তারা।
বাবা মো. ফজাই মোল্লা জানান, তার ছেলে সুস্থ ছিল। কঠোর পরিশ্রম করতে পারত। নিজের কাজ করার পর সাংসারিক অন্য কাজেও সাহায্য করত। বছর দশেক আগে হঠাৎ করেই তার মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু টাকার অভাবে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। একারণে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। বাড়িতে আনার পর মাঝে মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যেত। সবাইকে মারধর করত। তাই বাধ্য হয়ে শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। তার মেয়ে হাজেরার এক সন্তান হয়েছিল। সন্তানসহ তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে হাজেরা। একদিন পানিতে ডুবে মারা যায় হাজেরার সন্তান। এই শোকে সেও মানসিক ভারসাম্য হারায়। ছেলে মেয়ের অসহায় জীবন দেখে কষ্টে তাদের বুকটা ফেটে যায়। কিন্তু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই তাদের। কেউ যদি একটু সহযোগিতা করত তাহলে ছেলে মেয়ে দুজনকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করতে পারতাম। মৃত্যুর আগে একটু সুস্থ দেখে যেতে পারতাম।
এলাকাবাসী বলছে, দুই ভাই-বোন অমানবিকভাবে বেঁচে আছে। তাদের চিকিৎসা করানো দরকার। সঠিক চিকিৎসা পেলে তারা আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসত বলে ধারণা তাদের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দুই ভাই-বোনের সহযোগিতার জন্য আকুল আবেদন জানান তারা।
পাংশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম আবু দারদা বলেন, প্রতিবন্ধী দুই ভাইবোন ইতিমধ্যেই উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ভাতা পাচ্ছেন। এর বাইরে যদি চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তাহলে পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদন পেলে সহযোগিতার চেষ্টা করবেন।




















