রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

আড়াই কোটি ঘণ্টা ভিউ! ঝড় তুলেছে ভয়ংকর চাকরির গল্প

বিনোদন ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • / 3
আড়াই কোটি ঘণ্টা ভিউ! ঝড় তুলেছে ভয়ংকর চাকরির গল্প

ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে অস্বাভাবিক বেতনের চাকরি, কিন্তু প্রতিটি কর্মস্থলেই অপেক্ষা করছে ভয়ংকর বিপদ। এমনই এক ব্যতিক্রমী গল্প নিয়ে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া দক্ষিণ কোরীয় সিরিজ ‘ডেড-এন্ড জব’। মুক্তির পরপরই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আট পর্বের সিরিজটি। জায়গা করে নিয়েছে নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের সেরা দশের তালিকায়। চাকরির বাজারে ভালো বেতনের কাজ পাওয়া কঠিন। তার ওপর ঋণের বোঝা, সংসারের চাপ আর প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ। অনেকের কাছেই একটি ভালো চাকরি যেন সোনার হরিণ। কিন্তু সেই চাকরিই যদি হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ? বেতন যদি হয় স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি, আর সেই অর্থ উপার্জনের জন্য প্রতিটি রাত কাটাতে হয় ভয়ংকর সব পরিস্থিতির মধ্যে? এমন অদ্ভুত ধারণা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘ডেড-এন্ড জব’। গত ৩০ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার এই মিস্ট্রি-হরর ফ্যান্টাসি সিরিজ। মুক্তির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দর্শকদের নজর কেড়েছে এটি। নেটফ্লিক্সের ২৬ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সাপ্তাহিক তালিকায় অ-ইংরেজি ভাষার সিরিজের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ‘ডেড-এন্ড জব’। ওই সপ্তাহে সিরিজটির ভিউ ছিল ৫০ লাখ। দর্শকেরা মোট ২ কোটি ৫৪ লাখ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন সিরিজটি দেখে। বাংলাদেশেও ভালো অবস্থানে রয়েছে সিরিজটি। নেটফ্লিক্সের বাংলাদেশের সেরা দশ সিরিজের তালিকায় তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে এটি। একই সময়ে বিশ্বের ৫১টি দেশের নেটফ্লিক্সের সেরা দশের তালিকায় ছিল সিরিজটি। দক্ষিণ কোরিয়ায় মুক্তির পরপরই স্থানীয় তালিকায় শীর্ষস্থানেও উঠে আসে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল তথ্য

ঋণ থেকে মুক্তির জন্য ভয়ংকর চাকরি

সিরিজটির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে বিয়ন হিয়ক জুন। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন লি জে উক। মায়ের একটি ভুল বিনিয়োগের কারণে বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝা এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে একসময় ভয়ংকর আর্থিক সংকটে পড়ে যান তিনি। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন হিয়ক জুন।ঠিক সেই সময় তাঁর সামনে আসে অদ্ভুত এক চাকরির সুযোগ। স্পাইডার হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার নামের একটি রহস্যময় প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সাধারণ পার্টটাইম চাকরির তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। এক রাতের কাজের জন্য মিলতে পারে ৪০ লাখ কোরীয় ওন পর্যন্ত।এমন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না হিয়ক জুন। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরই বুঝতে পারেন, এই অর্থের বিনিময়ে তাঁকে যে মূল্য দিতে হবে, তা মোটেও সহজ নয়।প্রতিটি কর্মস্থলে রয়েছে অদ্ভুত কিছু নিয়ম। মধ্যরাতে কনভিনিয়েন্স স্টোরে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় ভয়ংকর সব অতিপ্রাকৃত ঘটনার। কোথাও অস্বাভাবিক শব্দ, কোথাও রহস্যময় উপস্থিতি, আবার কোথাও মানুষের পরিচিত পরিবেশেই লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর প্রাণী। এমনকি কয়েক শ ইঁদুর মিলে তৈরি করে এক বিশাল দানবীয় প্রাণীচাকরির প্রতিটি শিফট যেন একেকটি বেঁচে থাকার লড়াই। আর এসব কাজের বিষয়ে বাইরে কাউকে কিছু বলা যাবে না—প্রতিষ্ঠানের রয়েছে এমন কঠোর শর্তও। এদিকে স্পাইডার এজেন্সির কর্মীদের ঘিরে ঘটতে থাকে একের পর এক অস্বাভাবিক দুর্ঘটনা। বিষয়টি তদন্ত করতে মাঠে নামেন দুর্ঘটনা তদন্তকারী ইয়োন জু। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন গো মিন সি। তদন্তের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির অন্ধকার দিক।অভিনয়ে লি জে উক, গো মিন সি ও কিম মিন হা‘ডেড-এন্ড জব’-এর অন্যতম আকর্ষণ এর অভিনয়শিল্পীরা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় চরিত্রে লি জে উকের অভিনয় গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত একজন তরুণের হতাশা, ভয়, অসহায়ত্ব এবং বিপদের মুহূর্তে তাঁর প্রতিক্রিয়া পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।লি জে উককে এর আগে ‘অ্যালকেমি অব সোলস’, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি ইউ’ ও ‘ডিয়ার হংরাং’-এর মতো কাজে দেখা গেছে। নতুন সিরিজে আগের চরিত্রগুলোর তুলনায় ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। এখানে ভয়ংকর পরিস্থিতির পাশাপাশি রয়েছে কমেডিরও সুযোগ। দুই ধরনের অভিনয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।গো মিন সি অভিনয় করেছেন ইয়োন জু চরিত্রে।সিরিজে তিনি একজন দুর্ঘটনা তদন্তকারী। স্পাইডার এজেন্সির কর্মকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে তাঁর অনুসন্ধান গল্পে যুক্ত করেছে গোয়েন্দা আবহ। ‘সুইট হোম’ ও ‘দ্য ফ্রগ’-এর মতো কাজের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী চরিত্রটিতে দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তুলেছেন।হিয়ক জুনের ছোট বোন জি ইউন চরিত্রে রয়েছেন কিম মিন হা। ‘পাচিনকো’ ও ‘লাইট শপ’-এ অভিনয় করে আলোচনায় আসা এই অভিনেত্রী নতুন সিরিজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দুই ভাই–বোনের খুনসুটি ও সম্পর্কের স্বাভাবিক মুহূর্তগুলো গল্পের ভয়ংকর আবহের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।অন্যদিকে রহস্যময় স্পাইডার এজেন্সির ব্যবস্থাপক মি. এস চরিত্রে অভিনয় করেছেন লি হি জুন।

শান্ত ও স্বাভাবিক আচরণের আড়ালে তাঁর চরিত্রে রয়েছে অস্বস্তিকর রহস্য। এ ছাড়া চোই হিউন উক, ইউন কিয়ং হোসহ আরও কয়েকজন অভিনয়শিল্পী রয়েছেন সিরিজটিতে।পরিচালনায় কিম দা মিনসিরিজটি পরিচালনা করেছেন কিম দা মিন। চিত্রনাট্য লিখেছেন কিয়ং মিন সন ও লি শিন জি। নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন ‘ডি.পি.’ ও ‘উইক হিরো ক্লাস ওয়ান’-এর নির্মাতা হান জুন হি।কিম দা মিন এর আগে ‘এ কিলার প্যারাডক্স’-এর চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। ‘ডেড-এন্ড জব’-এ তিনি ভৌতিক গল্পের জন্য বেছে নিয়েছেন খুব পরিচিত কিছু জায়গা। কনভিনিয়েন্স স্টোর, সিনেমা হল কিংবা দুধ সরবরাহের সাধারণ কর্মস্থল—সবখানেই তৈরি করেছেন ভয়ের পরিবেশ।জনপ্রিয়তার কারণ কী?সিরিজটির জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এর ব্যতিক্রমী গল্প। হরর, কমেডি, রহস্য ও ফ্যান্টাসির মিশ্রণ দর্শকদের জন্য তৈরি করেছে আলাদা অভিজ্ঞতা। প্রতিটি পর্বে নতুন কর্মস্থল, নতুন নিয়ম এবং নতুন বিপদের মুখোমুখি হতে হয় কেন্দ্রীয় চরিত্রকে। ফলে গল্পে একঘেয়েমি আসার সুযোগ তুলনামূলক কম।তবে শুধু ভৌতিক উপাদানই নয়, সিরিজটির গল্পের সঙ্গে বাস্তব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও চাকরির বাজারের চাপ।বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ ভালো বেতনের চাকরির জন্য ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন। কখনো অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, কখনো অতিরিক্ত কাজের চাপ, আবার কখনো চাকরি হারানোর ভয় তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়।

সিরিজটি এই বাস্তবতাকেই অতিপ্রাকৃত ভয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছে।হিয়ক জুনের কাছে অস্বাভাবিক বেতনের চাকরিটি শুধু অর্থ উপার্জনের সুযোগ নয়, ঋণ থেকে মুক্তির একটি পথ। কিন্তু সেই সুযোগের পেছনে কী ভয়ংকর মূল্য লুকিয়ে আছে, তা তিনি শুরুতে বুঝতে পারেন না। এই পরিস্থিতি দর্শকদের সামনে একটি প্রশ্নও রাখে—অর্থের প্রয়োজন কতটা হলে একজন মানুষ নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারেনসমালোচকদের চোখে ‘ডেড-এন্ড জব’সিরিজটি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র হলেও প্রশংসার জায়গাও রয়েছে। বিশেষ করে এর গল্পের ধারণা, ভৌতিক আবহ ও অভিনয় নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনোদনবিষয়ক ওয়েবসাইট ডেসাইডার সিরিজটিকে ‘স্ট্রিম ইট’ বা দেখার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, প্রতিটি পর্বে নতুন ধরনের ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সিরিজটি হররপ্রেমীদের জন্য উপভোগ্য হতে পারে। কয়েক শ ইঁদুর মিলে তৈরি হওয়া বিশাল প্রাণীটির দৃশ্যও তাদের নজর কেড়েছে। বিশেষ দৃশ্যপ্রভাবের প্রশংসা করেছে গণমাধ্যমটি। তবে চরিত্রগুলোর গভীরতা আরও ভালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল বলেও মনে করেছে তারা।ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস সিরিজটিকে পাঁচের মধ্যে তিন তারকা দিয়েছে। তাদের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রচলিত কোরীয় হরর ও থ্রিলার সিরিজের তুলনায় ‘ডেড-এন্ড জব’-এর গল্পে নতুনত্ব রয়েছে। লি জে উকের অভিনয়, গো মিন সির আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং কিম মিন হা ও লি জে উকের পর্দার ভাই–বোনের রসায়ন প্রশংসা পেয়েছে।তবে সবকিছুই যে সমালোচকদের মন জয় করেছে, তা নয়। বিশেষ করে কিছু দানব ও অতিপ্রাকৃত দৃশ্যের কম্পিউটারনির্ভর দৃশ্যপ্রভাব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মনে করেছে হিন্দুস্তান টাইমস। এ ছাড়া প্রতিটি পর্বে আলাদা চাকরির ঘটনা দেখাতে গিয়ে মূল রহস্যের বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও তাদের পর্যবেক্ষণ।দর্শকের আগ্রহ বাড়ছেমুক্তির পর আন্তর্জাতিক দর্শকদের মধ্যেও সিরিজটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক আলোচনা

১০ দিনে ৮ কোটি ভিউ! চমকে দিল ‘অ্যাপেক্স’

দক্ষিণ কোরীয় সংবাদমাধ্যম স্পোর্টস চোসুনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দর্শকেরা সিরিজটির অভিনয়, বিশেষ দৃশ্যপ্রভাব, সংগীত ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে ফ্যান্টাসির মিশ্রণের প্রশংসা করেছেন।অনেক দর্শক এর গল্পকে বাস্তব জীবনের চাকরির চাপের ভৌতিক রূপ হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ একে জীবন্ত হরর গেমের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আবার প্রতিটি পর্বে ভিন্ন ধরনের বিপদ ও পরিবেশের কারণে সিরিজটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।আট পর্বের গল্প‘ডেড-এন্ড জব’-এর প্রথম মৌসুমে রয়েছে মোট আটটি পর্ব। রহস্য, ভৌতিক ঘটনা ও কমেডির মিশেলে সাজানো হয়েছে প্রতিটি পর্ব। গল্পের শুরুতে একটি অস্বাভাবিক চাকরি দিয়ে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও পরবর্তী ঘটনাগুলোয় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় স্পাইডার এজেন্সির রহস্য।সব মিলিয়ে প্রচলিত হরর সিরিজের বাইরে গিয়ে কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও অতিপ্রাকৃত আতঙ্ককে একসঙ্গে পর্দায় তুলে ধরেছে ‘ডেড-এন্ড জব’। গল্পের কিছু দুর্বলতা ও দৃশ্যপ্রভাবের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ব্যতিক্রমী ভাবনা, অভিনয় এবং পর্বভিত্তিক নতুন বিপদের কারণে সিরিজটি দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে।কোরিয়া টাইমস, নেটফ্লিক্সডটকম ও স্ক্রিনর্যান্ট অবলম্বনে

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

আড়াই কোটি ঘণ্টা ভিউ! ঝড় তুলেছে ভয়ংকর চাকরির গল্প

প্রকাশের সময় : ০৮:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে অস্বাভাবিক বেতনের চাকরি, কিন্তু প্রতিটি কর্মস্থলেই অপেক্ষা করছে ভয়ংকর বিপদ। এমনই এক ব্যতিক্রমী গল্প নিয়ে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া দক্ষিণ কোরীয় সিরিজ ‘ডেড-এন্ড জব’। মুক্তির পরপরই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আট পর্বের সিরিজটি। জায়গা করে নিয়েছে নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের সেরা দশের তালিকায়। চাকরির বাজারে ভালো বেতনের কাজ পাওয়া কঠিন। তার ওপর ঋণের বোঝা, সংসারের চাপ আর প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ। অনেকের কাছেই একটি ভালো চাকরি যেন সোনার হরিণ। কিন্তু সেই চাকরিই যদি হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ? বেতন যদি হয় স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি, আর সেই অর্থ উপার্জনের জন্য প্রতিটি রাত কাটাতে হয় ভয়ংকর সব পরিস্থিতির মধ্যে? এমন অদ্ভুত ধারণা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘ডেড-এন্ড জব’। গত ৩০ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার এই মিস্ট্রি-হরর ফ্যান্টাসি সিরিজ। মুক্তির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক দর্শকদের নজর কেড়েছে এটি। নেটফ্লিক্সের ২৬ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সাপ্তাহিক তালিকায় অ-ইংরেজি ভাষার সিরিজের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ‘ডেড-এন্ড জব’। ওই সপ্তাহে সিরিজটির ভিউ ছিল ৫০ লাখ। দর্শকেরা মোট ২ কোটি ৫৪ লাখ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন সিরিজটি দেখে। বাংলাদেশেও ভালো অবস্থানে রয়েছে সিরিজটি। নেটফ্লিক্সের বাংলাদেশের সেরা দশ সিরিজের তালিকায় তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে এটি। একই সময়ে বিশ্বের ৫১টি দেশের নেটফ্লিক্সের সেরা দশের তালিকায় ছিল সিরিজটি। দক্ষিণ কোরিয়ায় মুক্তির পরপরই স্থানীয় তালিকায় শীর্ষস্থানেও উঠে আসে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল তথ্য

ঋণ থেকে মুক্তির জন্য ভয়ংকর চাকরি

সিরিজটির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে বিয়ন হিয়ক জুন। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন লি জে উক। মায়ের একটি ভুল বিনিয়োগের কারণে বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝা এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে একসময় ভয়ংকর আর্থিক সংকটে পড়ে যান তিনি। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন হিয়ক জুন।ঠিক সেই সময় তাঁর সামনে আসে অদ্ভুত এক চাকরির সুযোগ। স্পাইডার হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার নামের একটি রহস্যময় প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সাধারণ পার্টটাইম চাকরির তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। এক রাতের কাজের জন্য মিলতে পারে ৪০ লাখ কোরীয় ওন পর্যন্ত।এমন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না হিয়ক জুন। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরই বুঝতে পারেন, এই অর্থের বিনিময়ে তাঁকে যে মূল্য দিতে হবে, তা মোটেও সহজ নয়।প্রতিটি কর্মস্থলে রয়েছে অদ্ভুত কিছু নিয়ম। মধ্যরাতে কনভিনিয়েন্স স্টোরে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় ভয়ংকর সব অতিপ্রাকৃত ঘটনার। কোথাও অস্বাভাবিক শব্দ, কোথাও রহস্যময় উপস্থিতি, আবার কোথাও মানুষের পরিচিত পরিবেশেই লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর প্রাণী। এমনকি কয়েক শ ইঁদুর মিলে তৈরি করে এক বিশাল দানবীয় প্রাণীচাকরির প্রতিটি শিফট যেন একেকটি বেঁচে থাকার লড়াই। আর এসব কাজের বিষয়ে বাইরে কাউকে কিছু বলা যাবে না—প্রতিষ্ঠানের রয়েছে এমন কঠোর শর্তও। এদিকে স্পাইডার এজেন্সির কর্মীদের ঘিরে ঘটতে থাকে একের পর এক অস্বাভাবিক দুর্ঘটনা। বিষয়টি তদন্ত করতে মাঠে নামেন দুর্ঘটনা তদন্তকারী ইয়োন জু। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন গো মিন সি। তদন্তের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির অন্ধকার দিক।অভিনয়ে লি জে উক, গো মিন সি ও কিম মিন হা‘ডেড-এন্ড জব’-এর অন্যতম আকর্ষণ এর অভিনয়শিল্পীরা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় চরিত্রে লি জে উকের অভিনয় গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত একজন তরুণের হতাশা, ভয়, অসহায়ত্ব এবং বিপদের মুহূর্তে তাঁর প্রতিক্রিয়া পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।লি জে উককে এর আগে ‘অ্যালকেমি অব সোলস’, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি ইউ’ ও ‘ডিয়ার হংরাং’-এর মতো কাজে দেখা গেছে। নতুন সিরিজে আগের চরিত্রগুলোর তুলনায় ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। এখানে ভয়ংকর পরিস্থিতির পাশাপাশি রয়েছে কমেডিরও সুযোগ। দুই ধরনের অভিনয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।গো মিন সি অভিনয় করেছেন ইয়োন জু চরিত্রে।সিরিজে তিনি একজন দুর্ঘটনা তদন্তকারী। স্পাইডার এজেন্সির কর্মকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে তাঁর অনুসন্ধান গল্পে যুক্ত করেছে গোয়েন্দা আবহ। ‘সুইট হোম’ ও ‘দ্য ফ্রগ’-এর মতো কাজের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী চরিত্রটিতে দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তুলেছেন।হিয়ক জুনের ছোট বোন জি ইউন চরিত্রে রয়েছেন কিম মিন হা। ‘পাচিনকো’ ও ‘লাইট শপ’-এ অভিনয় করে আলোচনায় আসা এই অভিনেত্রী নতুন সিরিজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দুই ভাই–বোনের খুনসুটি ও সম্পর্কের স্বাভাবিক মুহূর্তগুলো গল্পের ভয়ংকর আবহের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।অন্যদিকে রহস্যময় স্পাইডার এজেন্সির ব্যবস্থাপক মি. এস চরিত্রে অভিনয় করেছেন লি হি জুন।

শান্ত ও স্বাভাবিক আচরণের আড়ালে তাঁর চরিত্রে রয়েছে অস্বস্তিকর রহস্য। এ ছাড়া চোই হিউন উক, ইউন কিয়ং হোসহ আরও কয়েকজন অভিনয়শিল্পী রয়েছেন সিরিজটিতে।পরিচালনায় কিম দা মিনসিরিজটি পরিচালনা করেছেন কিম দা মিন। চিত্রনাট্য লিখেছেন কিয়ং মিন সন ও লি শিন জি। নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন ‘ডি.পি.’ ও ‘উইক হিরো ক্লাস ওয়ান’-এর নির্মাতা হান জুন হি।কিম দা মিন এর আগে ‘এ কিলার প্যারাডক্স’-এর চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। ‘ডেড-এন্ড জব’-এ তিনি ভৌতিক গল্পের জন্য বেছে নিয়েছেন খুব পরিচিত কিছু জায়গা। কনভিনিয়েন্স স্টোর, সিনেমা হল কিংবা দুধ সরবরাহের সাধারণ কর্মস্থল—সবখানেই তৈরি করেছেন ভয়ের পরিবেশ।জনপ্রিয়তার কারণ কী?সিরিজটির জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এর ব্যতিক্রমী গল্প। হরর, কমেডি, রহস্য ও ফ্যান্টাসির মিশ্রণ দর্শকদের জন্য তৈরি করেছে আলাদা অভিজ্ঞতা। প্রতিটি পর্বে নতুন কর্মস্থল, নতুন নিয়ম এবং নতুন বিপদের মুখোমুখি হতে হয় কেন্দ্রীয় চরিত্রকে। ফলে গল্পে একঘেয়েমি আসার সুযোগ তুলনামূলক কম।তবে শুধু ভৌতিক উপাদানই নয়, সিরিজটির গল্পের সঙ্গে বাস্তব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও চাকরির বাজারের চাপ।বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ ভালো বেতনের চাকরির জন্য ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন। কখনো অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, কখনো অতিরিক্ত কাজের চাপ, আবার কখনো চাকরি হারানোর ভয় তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়।

সিরিজটি এই বাস্তবতাকেই অতিপ্রাকৃত ভয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছে।হিয়ক জুনের কাছে অস্বাভাবিক বেতনের চাকরিটি শুধু অর্থ উপার্জনের সুযোগ নয়, ঋণ থেকে মুক্তির একটি পথ। কিন্তু সেই সুযোগের পেছনে কী ভয়ংকর মূল্য লুকিয়ে আছে, তা তিনি শুরুতে বুঝতে পারেন না। এই পরিস্থিতি দর্শকদের সামনে একটি প্রশ্নও রাখে—অর্থের প্রয়োজন কতটা হলে একজন মানুষ নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারেনসমালোচকদের চোখে ‘ডেড-এন্ড জব’সিরিজটি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র হলেও প্রশংসার জায়গাও রয়েছে। বিশেষ করে এর গল্পের ধারণা, ভৌতিক আবহ ও অভিনয় নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনোদনবিষয়ক ওয়েবসাইট ডেসাইডার সিরিজটিকে ‘স্ট্রিম ইট’ বা দেখার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, প্রতিটি পর্বে নতুন ধরনের ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সিরিজটি হররপ্রেমীদের জন্য উপভোগ্য হতে পারে। কয়েক শ ইঁদুর মিলে তৈরি হওয়া বিশাল প্রাণীটির দৃশ্যও তাদের নজর কেড়েছে। বিশেষ দৃশ্যপ্রভাবের প্রশংসা করেছে গণমাধ্যমটি। তবে চরিত্রগুলোর গভীরতা আরও ভালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল বলেও মনে করেছে তারা।ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস সিরিজটিকে পাঁচের মধ্যে তিন তারকা দিয়েছে। তাদের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রচলিত কোরীয় হরর ও থ্রিলার সিরিজের তুলনায় ‘ডেড-এন্ড জব’-এর গল্পে নতুনত্ব রয়েছে। লি জে উকের অভিনয়, গো মিন সির আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং কিম মিন হা ও লি জে উকের পর্দার ভাই–বোনের রসায়ন প্রশংসা পেয়েছে।তবে সবকিছুই যে সমালোচকদের মন জয় করেছে, তা নয়। বিশেষ করে কিছু দানব ও অতিপ্রাকৃত দৃশ্যের কম্পিউটারনির্ভর দৃশ্যপ্রভাব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মনে করেছে হিন্দুস্তান টাইমস। এ ছাড়া প্রতিটি পর্বে আলাদা চাকরির ঘটনা দেখাতে গিয়ে মূল রহস্যের বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও তাদের পর্যবেক্ষণ।দর্শকের আগ্রহ বাড়ছেমুক্তির পর আন্তর্জাতিক দর্শকদের মধ্যেও সিরিজটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক আলোচনা

১০ দিনে ৮ কোটি ভিউ! চমকে দিল ‘অ্যাপেক্স’

দক্ষিণ কোরীয় সংবাদমাধ্যম স্পোর্টস চোসুনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দর্শকেরা সিরিজটির অভিনয়, বিশেষ দৃশ্যপ্রভাব, সংগীত ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে ফ্যান্টাসির মিশ্রণের প্রশংসা করেছেন।অনেক দর্শক এর গল্পকে বাস্তব জীবনের চাকরির চাপের ভৌতিক রূপ হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ একে জীবন্ত হরর গেমের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আবার প্রতিটি পর্বে ভিন্ন ধরনের বিপদ ও পরিবেশের কারণে সিরিজটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।আট পর্বের গল্প‘ডেড-এন্ড জব’-এর প্রথম মৌসুমে রয়েছে মোট আটটি পর্ব। রহস্য, ভৌতিক ঘটনা ও কমেডির মিশেলে সাজানো হয়েছে প্রতিটি পর্ব। গল্পের শুরুতে একটি অস্বাভাবিক চাকরি দিয়ে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও পরবর্তী ঘটনাগুলোয় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় স্পাইডার এজেন্সির রহস্য।সব মিলিয়ে প্রচলিত হরর সিরিজের বাইরে গিয়ে কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও অতিপ্রাকৃত আতঙ্ককে একসঙ্গে পর্দায় তুলে ধরেছে ‘ডেড-এন্ড জব’। গল্পের কিছু দুর্বলতা ও দৃশ্যপ্রভাবের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ব্যতিক্রমী ভাবনা, অভিনয় এবং পর্বভিত্তিক নতুন বিপদের কারণে সিরিজটি দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে।কোরিয়া টাইমস, নেটফ্লিক্সডটকম ও স্ক্রিনর্যান্ট অবলম্বনে