বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot

ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই নির্মাতাকে কতটা চেনেন

বিনোদন ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০১:১৩:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / 4
ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই নির্মাতাকে কতটা চেনেন

উষ্কখুষ্ক চুল, পাঞ্জাবির ওপর বোতামখোলা খাদির জ্যাকেট, কাঁধে একটা ঝোলা আর জ্বলজ্বলে দুটো চোখ; নাম বলে না দিলেও সিনেমাপ্রেমীরা জানেন তিনি ঋত্বিক ঘটক। ৫০ বছরের জীবনে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা করেছেন আটটি, তাঁর সেসব সিনেমার প্রভাব উপমহাদেশ তো বটেই, ছড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। মৃত্যুর পরই যেন ঋত্বিককে নতুন করে আবিষ্কার করেছে বিশ্ব। আজ ৪ নভেম্বর, প্রয়াত চলচ্চিত্রকারের জন্মবার্ষিকী।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল তথ্য

১৯২৫ সালকে সিনেমাপ্রেমীরা আলাদা করে মনে রাখবেন। ঋত্বিক ঘটকের জন্ম, আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ আর চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গোল্ড রাশ’-এর মুক্তি মিলিয়ে গত শতাব্দীর বছরটি একেবারেই আলাদা। তবে আজ কেবল ঋত্বিকের কথাই হোক, আজকের দিনে জন্ম নেওয়া ঢাকার সেই ছেলেটি, যিনি কিনা ভারতীয় সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছিলেন পুরোপুরি। যখন অন্য নির্মাতারা মেলোড্রামা থেকে দূরে সরে সূক্ষ্ম আবেগ প্রকাশে পশ্চিমের পথ অনুসরণ করছিলেন, ঋত্বিক ছিলেন পুরোপুরি স্বতন্ত্র। ভারতীয় মেলোড্রামাকে ফোক, ক্ল্যাসিক্যাল, পুরাণ আর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।

জিন্দাবাহার লেন ও অন্যান্য৪ নভেম্বর ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে ঋত্বিকের জন্মের সাত মিনিটের মাথায় পৃথিবীতে আসেন ছোট বোন প্রতীতি দেবী। বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক আর মা ইন্দুবালা দেবীর ৯ ছেলেমেয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন এই দুজন। ঋত্বিকের ভাই-বোনদের প্রায় সবাই লিখতেন, গাইতেন, আঁকতেন, ছবি তুলতেন; শিল্পচর্চার প্রেরণা পরিবারেই পেয়েছিলেন তিনি।নিজের স্মৃতিকথায় প্রতীতি দেবী লিখেছেন, ‘আমাদের এমন একটি পরিবার, যেখানে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছিল উঁচু দরের।’ যে পরিবারে নাটকের আয়োজন হতো নিয়মিত, পরিবারের সদস্যরাই তাতে অংশ নিতেন।প্রতীতি লিখেছেন, কৈশোরেই ঋত্বিকের মধ্যে নিগৃহীত মানবতার প্রতি সমবেদনা দেখতে পান। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় ঋত্বিক মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পান। পরিবারের সদস্যরা তাই ঠিক করেন, সাধারণ স্কুলের পরিবর্তে তাঁকে কারিগরি স্কুলে পড়ানো হবে। ভারতের কানপুরের একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। কানপুর তখন শিল্প এলাকা। শ্রমিকদের ১৮ ঘণ্টার বেশি খাটানো হতো। অল্প বয়সেই শ্রমিকের সংস্পর্শে এসে তাঁদের নিপীড়িত জীবন উপলব্ধি করেন ঋত্বিক। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শ্রমিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয় ঋত্বিককে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা শুরু হলে তাঁদের পরিবার চলে যায় কলকাতায়। কে জানত, এই চলে যাওয়া, দেশভাগ তরুণ ঋত্বিকের মনে এতটাই ছাপ ফেলবে, যার অভিঘাত পরে বারবার তাঁর সৃষ্টিতে ফিরে আসবে!

দেশভাগের বেদনাদেশভাগের বেদনার ভাষা কি আজও তৈরি হয়েছে? তবে ঋত্বিকের ছবি নিঃসন্দেহে বিষাদের সেই অতলান্ত গভীরতাকে ছুঁতে পেরেছে অনেকবারই। নিজে যন্ত্রণায় নীল হয়েও প্রতিবাদী চেতনার প্রতি আস্থা ঋত্বিক অবিচল রেখেছিলেন আজীবন। ‘সুবর্ণ–রেখা’য় জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে উদ্বাস্তুশিবিরে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘নবজীবন কলোনি’। সে যৌথ আদর্শ থেকে নিজের একক সুখের অন্বেষায় চলে যাওয়া চরিত্রটার করুণ পরিণতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন বাড়ির সন্ধান—পর্দায় মানবজীবনের গোটা চক্রকেই যেন ধারণ করলেন ঋত্বিক।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক আলোচনা

অবিভক্ত বাংলা ঋত্বিকের শিল্পবোধের প্রাণকেন্দ্রে রয়ে যাওয়ার মূল কারণ সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিতে থেকে যাওয়া প্রাকৃতিক ভূগোল। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার উদ্বাস্তুর সঙ্গে ঋত্বিক দেখেছিলেন, কীভাবে চিরকালের চেনা মাতৃভূমি চোখের নিমেষে অচেনা হয়ে ওঠে। ‘নাগরিক’ ছবিতেও উমা ও রামু দেশভাগ–পরবর্তী কলকাতায় আনন্দময় এক ভবিষ্যতের দিন বুনতে থাকে। এই কল্পনা আসে ফেলে আসা স্মৃতি থেকে। দাঙ্গা ও দেশভাগ–পরবর্তী কলকাতায় দাঁড়িয়ে এই অপরূপ মায়াময় ভবিষ্যতের ছবি ঋত্বিক আঁকছেন ১৯৫২ সালে। ‘অযান্ত্রিক’ সরাসরি দেশভাগের ক্ষত বহন না করেও বৃহত্তর বিহারের প্রাকৃতিক পটভূমিতে আধিপত্যকারী সভ্যতার সংজ্ঞার বিপক্ষে গিয়ে মানুষ, প্রকৃতি ও যন্ত্রের সম্পর্ক ঘিরে আবর্তিত হয়।

‘সুবর্ণ–রেখা’ ছবির বাউলের দল এই অখণ্ড মানচিত্রের বাহক, তাদের ধর্মনিরপেক্ষ জীবন ও সীমান্তভেদী গান দিয়ে শুরু হয় সিনেমা। আর ‘কোমল গান্ধার’-এর সেই বিখ্যাত বাফার শট কে ভুলতে পারে! দেশভাগের ফলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে রেললাইন, কিন্তু ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ট্র্যাকিং শট যেন অনন্তযাত্রা কোনো পথিকের। ভৃগু ও অনসূয়া স্থির, তবু পরিবেশের গুল্মলতা অবিরত আর্তনাদ করে চলেছে, তারা কাঁদছে।সিনেমার ঋত্বিক, ঋত্বিকের সিনেমা‘ঋত্বিক দুর্ভাগ্যবশত জীবদ্দশায় বাংলা চলচ্চিত্র দর্শকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন। কেবল ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কিছুটা সফল হয়েছিল। অথচ তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভা, যার আবেগের গভীরতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভারতীয় সিনেমায় বিরল।’ ঋত্বিকের সিনেমা অ্যান্ড আই বইয়ের ভূমিকায় নির্মাতা সম্পর্কে এভাবেই লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়।

ঋত্বিক ছিলেন ওস্তাদ নির্মাতা; যেমন শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল, তেমনই অতুলনীয় সাউন্ডট্র্যাক নির্বাচন। অথচ কত কষ্ট করে, কত কম বাজেটের মধ্যে ছবি তৈরি করতেন! এত বাধা কাটিয়েও অনবদ্য লেন্স ব্যবহার করে সিনেমার যে ভাষা তিনি তৈরি করেছিলেন, তা মাথা ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য। ‘অযান্ত্রিক’ তো একটা গাড়ি নিয়ে। একটা জড়বস্তুমাত্র। ঋত্বিক তাতেও প্রাণ সঞ্চার করে অবাক করে দিলেন। গাড়ির দুঃখ-কষ্ট-বেদনার কথা উঠে এল পর্দায়। ‘সুবর্ণ–রেখা’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় তিনি বারবার অতিনাটকীয়তা ব্যবহার করেছেন। আর সেসব মুহূর্তে ভরে দিয়েছেন উথালপাতাল আবেগ। এভাবে পুরো দৃশ্য অন্য স্তরে পৌঁছে গেছে। ‘সুবর্ণ–রেখা’য় কাজের লোক বলছে, ‘এখানে প্রজাপতি পাওয়া যায়, এখানে কী সুন্দর সূর্য ওঠে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে অভি ভট্টাচার্য বলছেন, ‘বাচ্চাদের মিথ্যে বলতে নেই।’ কী আশ্চর্য, যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল, ২০ বছর পর তার নাতি ফিরে এসে প্রশ্ন করছে, এখানে কি প্রজাপতি পাওয়া যায়? এখানে কি সূর্য ওঠে? অভি তার উত্তর দিতে পারছেন না!

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই নির্মাতাকে কতটা চেনেন

প্রকাশের সময় : ০১:১৩:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

উষ্কখুষ্ক চুল, পাঞ্জাবির ওপর বোতামখোলা খাদির জ্যাকেট, কাঁধে একটা ঝোলা আর জ্বলজ্বলে দুটো চোখ; নাম বলে না দিলেও সিনেমাপ্রেমীরা জানেন তিনি ঋত্বিক ঘটক। ৫০ বছরের জীবনে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা করেছেন আটটি, তাঁর সেসব সিনেমার প্রভাব উপমহাদেশ তো বটেই, ছড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। মৃত্যুর পরই যেন ঋত্বিককে নতুন করে আবিষ্কার করেছে বিশ্ব। আজ ৪ নভেম্বর, প্রয়াত চলচ্চিত্রকারের জন্মবার্ষিকী।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল তথ্য

১৯২৫ সালকে সিনেমাপ্রেমীরা আলাদা করে মনে রাখবেন। ঋত্বিক ঘটকের জন্ম, আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ আর চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গোল্ড রাশ’-এর মুক্তি মিলিয়ে গত শতাব্দীর বছরটি একেবারেই আলাদা। তবে আজ কেবল ঋত্বিকের কথাই হোক, আজকের দিনে জন্ম নেওয়া ঢাকার সেই ছেলেটি, যিনি কিনা ভারতীয় সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছিলেন পুরোপুরি। যখন অন্য নির্মাতারা মেলোড্রামা থেকে দূরে সরে সূক্ষ্ম আবেগ প্রকাশে পশ্চিমের পথ অনুসরণ করছিলেন, ঋত্বিক ছিলেন পুরোপুরি স্বতন্ত্র। ভারতীয় মেলোড্রামাকে ফোক, ক্ল্যাসিক্যাল, পুরাণ আর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।

জিন্দাবাহার লেন ও অন্যান্য৪ নভেম্বর ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে ঋত্বিকের জন্মের সাত মিনিটের মাথায় পৃথিবীতে আসেন ছোট বোন প্রতীতি দেবী। বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক আর মা ইন্দুবালা দেবীর ৯ ছেলেমেয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন এই দুজন। ঋত্বিকের ভাই-বোনদের প্রায় সবাই লিখতেন, গাইতেন, আঁকতেন, ছবি তুলতেন; শিল্পচর্চার প্রেরণা পরিবারেই পেয়েছিলেন তিনি।নিজের স্মৃতিকথায় প্রতীতি দেবী লিখেছেন, ‘আমাদের এমন একটি পরিবার, যেখানে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছিল উঁচু দরের।’ যে পরিবারে নাটকের আয়োজন হতো নিয়মিত, পরিবারের সদস্যরাই তাতে অংশ নিতেন।প্রতীতি লিখেছেন, কৈশোরেই ঋত্বিকের মধ্যে নিগৃহীত মানবতার প্রতি সমবেদনা দেখতে পান। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় ঋত্বিক মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পান। পরিবারের সদস্যরা তাই ঠিক করেন, সাধারণ স্কুলের পরিবর্তে তাঁকে কারিগরি স্কুলে পড়ানো হবে। ভারতের কানপুরের একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। কানপুর তখন শিল্প এলাকা। শ্রমিকদের ১৮ ঘণ্টার বেশি খাটানো হতো। অল্প বয়সেই শ্রমিকের সংস্পর্শে এসে তাঁদের নিপীড়িত জীবন উপলব্ধি করেন ঋত্বিক। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শ্রমিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয় ঋত্বিককে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা শুরু হলে তাঁদের পরিবার চলে যায় কলকাতায়। কে জানত, এই চলে যাওয়া, দেশভাগ তরুণ ঋত্বিকের মনে এতটাই ছাপ ফেলবে, যার অভিঘাত পরে বারবার তাঁর সৃষ্টিতে ফিরে আসবে!

দেশভাগের বেদনাদেশভাগের বেদনার ভাষা কি আজও তৈরি হয়েছে? তবে ঋত্বিকের ছবি নিঃসন্দেহে বিষাদের সেই অতলান্ত গভীরতাকে ছুঁতে পেরেছে অনেকবারই। নিজে যন্ত্রণায় নীল হয়েও প্রতিবাদী চেতনার প্রতি আস্থা ঋত্বিক অবিচল রেখেছিলেন আজীবন। ‘সুবর্ণ–রেখা’য় জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে উদ্বাস্তুশিবিরে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘নবজীবন কলোনি’। সে যৌথ আদর্শ থেকে নিজের একক সুখের অন্বেষায় চলে যাওয়া চরিত্রটার করুণ পরিণতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন বাড়ির সন্ধান—পর্দায় মানবজীবনের গোটা চক্রকেই যেন ধারণ করলেন ঋত্বিক।

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক আলোচনা

অবিভক্ত বাংলা ঋত্বিকের শিল্পবোধের প্রাণকেন্দ্রে রয়ে যাওয়ার মূল কারণ সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিতে থেকে যাওয়া প্রাকৃতিক ভূগোল। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার উদ্বাস্তুর সঙ্গে ঋত্বিক দেখেছিলেন, কীভাবে চিরকালের চেনা মাতৃভূমি চোখের নিমেষে অচেনা হয়ে ওঠে। ‘নাগরিক’ ছবিতেও উমা ও রামু দেশভাগ–পরবর্তী কলকাতায় আনন্দময় এক ভবিষ্যতের দিন বুনতে থাকে। এই কল্পনা আসে ফেলে আসা স্মৃতি থেকে। দাঙ্গা ও দেশভাগ–পরবর্তী কলকাতায় দাঁড়িয়ে এই অপরূপ মায়াময় ভবিষ্যতের ছবি ঋত্বিক আঁকছেন ১৯৫২ সালে। ‘অযান্ত্রিক’ সরাসরি দেশভাগের ক্ষত বহন না করেও বৃহত্তর বিহারের প্রাকৃতিক পটভূমিতে আধিপত্যকারী সভ্যতার সংজ্ঞার বিপক্ষে গিয়ে মানুষ, প্রকৃতি ও যন্ত্রের সম্পর্ক ঘিরে আবর্তিত হয়।

‘সুবর্ণ–রেখা’ ছবির বাউলের দল এই অখণ্ড মানচিত্রের বাহক, তাদের ধর্মনিরপেক্ষ জীবন ও সীমান্তভেদী গান দিয়ে শুরু হয় সিনেমা। আর ‘কোমল গান্ধার’-এর সেই বিখ্যাত বাফার শট কে ভুলতে পারে! দেশভাগের ফলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে রেললাইন, কিন্তু ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ট্র্যাকিং শট যেন অনন্তযাত্রা কোনো পথিকের। ভৃগু ও অনসূয়া স্থির, তবু পরিবেশের গুল্মলতা অবিরত আর্তনাদ করে চলেছে, তারা কাঁদছে।সিনেমার ঋত্বিক, ঋত্বিকের সিনেমা‘ঋত্বিক দুর্ভাগ্যবশত জীবদ্দশায় বাংলা চলচ্চিত্র দর্শকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন। কেবল ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কিছুটা সফল হয়েছিল। অথচ তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভা, যার আবেগের গভীরতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভারতীয় সিনেমায় বিরল।’ ঋত্বিকের সিনেমা অ্যান্ড আই বইয়ের ভূমিকায় নির্মাতা সম্পর্কে এভাবেই লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়।

ঋত্বিক ছিলেন ওস্তাদ নির্মাতা; যেমন শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল, তেমনই অতুলনীয় সাউন্ডট্র্যাক নির্বাচন। অথচ কত কষ্ট করে, কত কম বাজেটের মধ্যে ছবি তৈরি করতেন! এত বাধা কাটিয়েও অনবদ্য লেন্স ব্যবহার করে সিনেমার যে ভাষা তিনি তৈরি করেছিলেন, তা মাথা ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য। ‘অযান্ত্রিক’ তো একটা গাড়ি নিয়ে। একটা জড়বস্তুমাত্র। ঋত্বিক তাতেও প্রাণ সঞ্চার করে অবাক করে দিলেন। গাড়ির দুঃখ-কষ্ট-বেদনার কথা উঠে এল পর্দায়। ‘সুবর্ণ–রেখা’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় তিনি বারবার অতিনাটকীয়তা ব্যবহার করেছেন। আর সেসব মুহূর্তে ভরে দিয়েছেন উথালপাতাল আবেগ। এভাবে পুরো দৃশ্য অন্য স্তরে পৌঁছে গেছে। ‘সুবর্ণ–রেখা’য় কাজের লোক বলছে, ‘এখানে প্রজাপতি পাওয়া যায়, এখানে কী সুন্দর সূর্য ওঠে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে অভি ভট্টাচার্য বলছেন, ‘বাচ্চাদের মিথ্যে বলতে নেই।’ কী আশ্চর্য, যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল, ২০ বছর পর তার নাতি ফিরে এসে প্রশ্ন করছে, এখানে কি প্রজাপতি পাওয়া যায়? এখানে কি সূর্য ওঠে? অভি তার উত্তর দিতে পারছেন না!