আফ্রিকার সম্পদে নজর রাশিয়ার, শাসকদের সুরক্ষায় ব্যস্ত পুতিন

- প্রকাশের সময় : ০৪:৩৩:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 13

আফ্রিকায় অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে রাশিয়া। মস্কোয় অনুষ্ঠেয় তৃতীয় রাশিয়া-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনে আফ্রিকার নেতাদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে।
তবে সমালোচকদের মতে, রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি সাধারণ আফ্রিকানদের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে মস্কোর স্বার্থ রক্ষা এবং মিত্র শাসকদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই বেশি ভূমিকা রাখছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আফ্রিকান ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি, বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট এভারিস্তে নাদাইশিমিয়ের বৃহস্পতিবার সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে যৌথ সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে।
সম্মেলনের পাশাপাশি দুই দিনের অর্থনৈতিক ও মানবিক ফোরামে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অর্থ পরিশোধব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। ২০২৭-২০২৯ মেয়াদের একটি নতুন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
২০১৯ সালে সোচিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনে ৯২টি চুক্তি হয়েছিল। সে সময় পুতিন বার্ষিক বাণিজ্য ৪ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
২০২৩ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে দ্বিতীয় সম্মেলনে আরও ১৬১টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির তুলনায় অগ্রগতি সীমিত। ২০২৫ সালে আফ্রিকার সঙ্গে রাশিয়ার পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ হাজার ৭১০ কোটি ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আফ্রিকায় রাশিয়ার রফতানি ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, বিপরীতে আমদানি মাত্র ৩২০ কোটি ডলার।
গম ও সারের মতো কৃষিপণ্য রফতানি এই বাণিজ্যঘাটতির অন্যতম কারণ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়া আফ্রিকায় ১ কোটি ২০ লাখ টনের বেশি গম পাঠিয়েছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তার চাহিদা পূরণ হলেও আফ্রিকার শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এর অবদান সীমিত।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও চুক্তি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। ২০১৯ সালে অ্যাঙ্গোলায় ১২০ কোটি ডলারের অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া কারখানা নির্মাণের চুক্তি করেছিল রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান উরালকেম। ২০২৩ সালে প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হয়।
অন্যদিকে, মিসরের এল দাবা এলাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম চারটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করছে। সেখানে ১৮ হাজারের বেশি মিসরীয় কর্মী নিয়োজিত থাকলেও প্রকল্পটির অর্থায়নে রয়েছে রাশিয়ার ২৫০ কোটি নয়, ২৫০০ কোটি ডলারের ঋণ- যা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে মিসরকে।
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে প্রস্তাবিত একটি জ্বালানি তেল পরিবহন পাইপলাইন প্রকল্পেও চুক্তির অসম শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যৌথ উদ্যোগের ৯০ শতাংশ মালিকানা পাবে রুশ স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ, আর কঙ্গোর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পাবে মাত্র ১০ শতাংশ। এর সঙ্গে রয়েছে ২৫ বছরের ছাড় এবং নির্ধারিত পরিবহন মাশুলের নিশ্চয়তা।
সামরিক উপস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
আফ্রিকায় রাশিয়ার সামরিক তৎপরতাও বাড়ছে। সুইডেনের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার ৩৯টি দেশের সঙ্গে রাশিয়ার অন্তত ৫৭টি সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। ওয়াগনার গোষ্ঠীর পাশাপাশি রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-নিয়ন্ত্রিত আফ্রিকা কর্পস মালি ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো দেশে সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তা দিচ্ছে।
তবে মালিতে এই সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৩ সালে কিদাল শহর দখল করলেও ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে সেটি হারায় রুশ-সমর্থিত বাহিনী। পরে অক্টোবরের শুরুতে বিমান হামলার পর শহরটি পুনর্দখলের দাবি করে তারা। কিন্তু বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মালির সরকারি বাহিনী ও আফ্রিকা কর্পসের ৪৯টি বিমান হামলায় ৮৯ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অভিযোগ, জুলাইয়ে মধ্য মালির বোম্বোরি গ্রামে আফ্রিকা কর্পসের সদস্যরা চার শিশুসহ নয়জনকে হত্যা করেন এবং বাড়িঘরে আগুন দেন। আটক বেসামরিক মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
নাইজারে অভ্যুত্থান দমন এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ফস্টিন-আর্চেঞ্জ তুয়াদেরার ক্ষমতা সুসংহত করতেও রাশিয়ার ভূমিকা রয়েছে। এসব দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, বিরোধীদের দমন এবং সাংবাদিকদের ওপর চাপ বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে।
আফ্রিকার গণমাধ্যম ও জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে মস্কোর বিরুদ্ধে। ফ্রান্স ২৪-এর এক অনুসন্ধানে ২০২৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ৩৫টি সংবাদমাধ্যমে রাশিয়াপন্থী প্রায় ৬৫০টি নিবন্ধ প্রকাশের তথ্য উঠে আসে। কিছু ক্ষেত্রে নিবন্ধপ্রতি ২৫০ থেকে ৭০০ ডলার দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
সমালোচকদের মতে, রাশিয়ার এই বিস্তৃত উপস্থিতি দেশটির জন্য খনিজ সম্পদে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং মিত্র শাসকদের সুরক্ষার সুযোগ তৈরি করছে। বিপরীতে সাধারণ আফ্রিকানদের ভুগতে হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অপূর্ণ উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির কারণে।
আফ্রিকার দেশগুলোর উচিত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের মতো রাশিয়ার কাছ থেকেও ন্যায্য বাণিজ্য, কার্যকর বিনিয়োগ, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বেসামরিক মানুষের ওপর নির্যাতনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো। সূত্র: আল-জাজিরা




















