ভারতে যুবকের দেহে মিলল নারীর প্রজনন অঙ্গ, বিস্মিত চিকিৎসকেরা
- প্রকাশের সময় : ১০:১৫:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- / 9
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বজবজের ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে তার দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির অস্তিত্ব পেয়েছেন চিকিৎসকেরা। ডায়মন্ড হারবারের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে এ ঘটনা ঘটে। চিকিৎসকদের মতে, এটি অত্যন্ত বিরল শারীরিক অবস্থা। এর প্রকৃত কারণ জানতে যুবকের ক্রোমোজোম পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার হার্নিয়ার চিকিৎসার জন্য নার্সিংহোমে ভর্তি হন ওই যুবক। পরদিন মঙ্গলবার অস্ত্রোপচারের সময় তার দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির উপস্থিতি দেখতে পান চিকিৎসকেরা। সাধারণত নারীদের প্রজননতন্ত্রের অংশ ডিম্বনালি ডিম্বাশয় থেকে নির্গত ডিম্বাণুকে জরায়ুর দিকে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
ওই যুবকের চিকিৎসক এইচ জামান জানান, রোগীকে পুরুষ হিসেবেই চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের সময় তার দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালি দেখতে পেয়ে চিকিৎসকেরা বিস্মিত হন। শুরু থেকে রোগীর পরিচয় সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকায় এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি তাদের প্রত্যাশায় ছিল না।
যুবকের শারীরিক গঠন ও যৌনবিকাশের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ক্রোমোজোম বিশ্লেষণের কথা ভাবছেন চিকিৎসকেরা। কলকাতার এসএসকেএম ও এনআরএসসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদেরও মত, এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ক্রোমোজোম পরীক্ষা জরুরি।
যৌনবিকাশের ভিন্নতা কী
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে আগে ‘সিউডোহেরম্যাফ্রোডিটিজম’ বলা হতো। বর্তমানে এ অবস্থাকে ‘ডিফারেন্সেস অব সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ (ডিএসডি) বা যৌনবিকাশের ভিন্নতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
এসএসকেএমের ইউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক সৌভিক চট্টোপাধ্যায়ের মতে, কারও বাহ্যিক শারীরিক গঠন দেখে তার ক্রোমোজোম, হরমোনের অবস্থা কিংবা অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। বিরল কিছু ক্ষেত্রে জিনগত ও প্রজননগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বাহ্যিক যৌন বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য থাকতে পারে।
তিনি জানান, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা ভ্রূণের বিকাশের সময় অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাব এ ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে বাহ্যিক গঠন পুরুষের মতো হলেই জিনগত বৈশিষ্ট্য বা প্রজননক্ষমতাও পুরুষের মতো হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে ক্রোমোজোম, হরমোন, অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ এবং বহির্গত যৌনাঙ্গের গঠন বিবেচনায় নিতে হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যান্ড্রোজেনের অতিরিক্ত প্রভাবে ক্লিটোরিস স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়ে পুরুষাঙ্গের মতো দেখাতে পারে। এমন ক্ষেত্রে অণ্ডকোষের উপস্থিতি ও গঠনও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ডায়মন্ড হারবারের ওই যুবকের দেহে অণ্ডকোষ ছিল না বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসকেরা।
জরায়ু ও ডিম্বনালি থাকার সম্ভাব্য কারণ
পুরুষের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির উপস্থিতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘পারসিসট্যান্ট ম্যুলেরিয়ান ডাক্ট সিন্ড্রোম’ (পিএমডিএস) নামের একটি বিরল অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন চিত্তরঞ্জন সেবা সদনের সাবেক অধ্যক্ষ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আশিস মুখোপাধ্যায়।
তিনি জানান, স্বাভাবিক পুরুষ ভ্রূণের বিকাশের সময় অণ্ডকোষ থেকে নিঃসৃত অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন বা মুলেরিয়ান ইনহিবিটিং ফ্যাক্টর (এমআইএফ) মুলেরিয়ান নালির বিকাশ বন্ধ করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটলে ওই নালি থেকে জরায়ু ও ডিম্বনালির মতো অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ থেকে যেতে পারে।
তবে বজবজের যুবকের ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে ক্রোমোজোম বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।
চিকিৎসার আগে প্রয়োজন কাউন্সেলিং
এ ধরনের ঘটনা একেবারে নজিরবিহীন নয়। প্রায় ১৮ বছর আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে একই ধরনের একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক উৎপল দে। বর্তমানে তিনি এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান।
উৎপল দে জানান, ওই রোগীরও হার্নিয়ার অস্ত্রোপচারের সময় ডিম্বনালির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের আগে রোগীর নিজস্ব পরিচয় ও পছন্দকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে যেভাবে জেনে ও বুঝে এসেছেন, চিকিৎসার নামে সেই পরিচয়কে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তাই প্রথমে রোগীর কাউন্সেলিং করা দরকার। এরপর তার ইচ্ছা ও প্রয়োজনকে মর্যাদা দিয়ে চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের বিরল শারীরিক অবস্থার কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি রোগীর মানসিক স্বস্তি, ব্যক্তিগত পরিচয় ও মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।




















