একটি ক্রিকেট ম্যাচ, দুটি সিনেমা: সৌরভ যখন আদালতে

- প্রকাশের সময় : ০৯:১৫:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / 1

দৃশ্যটা আইকনিক।লর্ডসের ঐতিহাসিক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে জার্সি খুলে উল্লাস করছেন সৌরভ গাঙ্গুলী। ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের যে কটা ছবি অবিস্মরণীয় হয়ে আছে, তারই একটি এটি।ঘটনাটি ২০০২ সালের ১৩ জুলাইয়ের। সেদিন লর্ডসে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ভারত।২৪ বছর পর সেই মুহূর্তই জড়িয়ে গেছে দুটি সিনেমার গল্পে, তৈরি হয়েছে আইনি বিরোধ। সৌরভের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়াই তাঁর নাম, পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত ব্যবহার করে বাণিজ্যিক সুবিধা নিচ্ছেন একটি চলচ্চিত্রের নির্মাতারা। বিষয়টি গড়িয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট পর্যন্ত।
খেলার মাঠের প্রেক্ষাপট ও মূল মুহূর্ত
সিনেমা নম্বর একবিতর্কের কেন্দ্রে হিন্দি সিনেমা ‘দুসরা: ইন্ডিয়াস আদার ফ্রিডম স্ট্রাগল’। অভিনয় দেও পরিচালিত ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে গত ২৩ অক্টোবর। এটি সৌরভের বায়োপিক নয়। গল্প রাজস্থানের একটি রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা তরুণী তারাকে নিয়ে। প্লাবিতা বোরঠাকুর অভিনীত এই চরিত্র নিজের জীবনের বাধা আর সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায় সৌরভের ক্রিকেটীয় জীবনে।পরিচালকের ভাষ্য, এটি সৌরভের বায়োপিক নয়। একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রভাব কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে, সেটিই ছবির বিষয়।তবে ছবির প্রচারে সৌরভের নাম, পরিচিতি আর ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের সেই মুহূর্ত ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, ট্রেলারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে আছে সৌরভের ক্যারিয়ারের নানা মুহূর্ত। অভিযোগ আছে, ছবির দ্বিতীয়ার্ধেও ন্যাটওয়েস্ট ফাইনাল আর তাঁর ক্যারিয়ারের বিভিন্ন মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ যে ছবি বায়োপিক নয়, সেখানে সৌরভই ঘুরেফিরে আসছেন, ঠিক যেমন লর্ডসের ব্যালকনিতে এসেছিলেন।সিনেমা নম্বর দুইবিরোধে ঢুকে পড়েছে আরেকটি সিনেমা। ‘দাদা: দ্য সৌরভ গাঙ্গুলী স্টোরি’। এটি সৌরভের অনুমোদিত বায়োপিক। ২০২১ সালের ৫ আগস্ট লভ ফিল্মস এলএলপির সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়। সেই চুক্তির অধীনে সৌরভের জীবন, ব্যক্তিগত ও পেশাগত যাত্রা, অভিজ্ঞতা ও অর্জন নিয়ে অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্ট নির্মাণ এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকার পায় প্রতিষ্ঠানটি।
রাজকুমার রাও অভিনীত এই বায়োপিকের শুটিং শেষ। মুক্তির তারিখ ঠিক হয়েছে ২০২৭ সালের ১৪ মে। লভ ফিল্মসের দাবি, প্রকল্পে তারা উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে এবং এর বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে তৃতীয় পক্ষের সঙ্গেও কাজ করেছে। তাদের আশঙ্কা, ‘দুসরা’য় সৌরভের পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের মুহূর্ত ব্যবহার হলে অনুমোদিত বায়োপিকের বাণিজ্যিক মূল্য ও একচ্ছত্র অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।বলা যায়, নায়কের বায়োপিক নিয়ে লড়াই হচ্ছে নায়কেরই নামে। আদালতে সৌরভ ও লভ ফিল্মসের যৌথ আবেদনে শুধু ব্যক্তিত্ব স্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগই নেই, চুক্তির একচ্ছত্র অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টিও তোলা হয়েছে। তাঁরা চেয়েছিলেন ‘দুসরা’র প্রেক্ষাগৃহ, ডিজিটালসহ সব ধরনের মুক্তি ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনী বন্ধ হোক। সঙ্গে প্রচারণামূলক উপকরণ ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা।
‘দুসরা’র পক্ষের যুক্তি কীনির্মাতার বক্তব্য, ছবিতে একজন ক্রিকেটারের সাফল্য ও প্রতিবাদী মুহূর্ত থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। তাঁর জীবনকাহিনি বানানো হয়নি। ‘দুসরা’র আইনজীবী মধু গাডোদিয়া হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছেন, ছবিতে ব্যবহৃত ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের ফুটেজের জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছে।তাঁদের আরেকটি যুক্তি, সৌরভের ব্যক্তিত্ব স্বত্ব থাকলেই ক্রিকেট ম্যাচের ফুটেজের মালিকানা তাঁর হয়ে যায় না।সৌরভের পক্ষের যুক্তি কীসৌরভের আইনজীবীরা আদালতে বলেছেন, ছবিতে সৌরভকে একধরনের ‘ছদ্ম নায়ক’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দর্শকের মনে ছবিটির সঙ্গে সৌরভের সংশ্লিষ্টতা বা অনুমোদন থাকার ধারণা তৈরি হতে পারে।তাঁদের বক্তব্য, ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের ফুটেজের মালিকানা এক বিষয়। কিন্তু সেই ফুটেজের সঙ্গে সৌরভের নাম, পরিচিতি ও বিখ্যাত উদ্যাপন জুড়ে দিয়ে একটি সিনেমার গল্প ও প্রচারে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়া একেবারেই ভিন্ন বিষয়। ফুটেজ ব্যবহারের অনুমতি পেলেই সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের ব্যক্তিত্ব ব্যবহারের অনুমতিও পাওয়া হয়ে যায় না।ব্যক্তিত্ব স্বত্ব আসলে কীনামটা শুনে ভারী লাগলেও ধারণাটা সোজা। ব্যক্তিত্ব স্বত্ব বলতে সাধারণভাবে একজন ব্যক্তির নাম, ছবি, অবয়ব, কণ্ঠ, পরিচিতি বা তাঁর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত বৈশিষ্ট্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বোঝায়। প্রচার স্বত্বের বিষয়টিও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।অন্যভাবে বললে, একটি হলো কোনো ক্রিকেট ম্যাচের ফুটেজ ব্যবহারের অধিকার। অন্যটি সেই ম্যাচের সঙ্গে যুক্ত একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অধিকার।
ম্যাচের বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
আদালতে কী ঘটেছেছবি মুক্তির আগেই দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সৌরভ ও লভ ফিল্মস। ২২ অক্টোবর আদালত ছবির প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি স্থগিত করতে রাজি হননি। বিচারপতি দীনেশ ভাটের অবকাশকালীন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ ছিল, মুক্তির আর মাত্র এক দিন বাকি থাকায় তখন ছবিটি আটকে দেওয়ার পক্ষে সুবিধার ভারসাম্য নির্মাতাদের দিকেই।২৩ অক্টোবর ছবিটি মুক্তি পায়। একই সময়ে আদালত নির্মাতাদের জবাব দিতে এবং ছবিটি দেখানোর ব্যবস্থা করতে বলেন, যাতে অভিযোগের বিষয়বস্তু সরাসরি পরীক্ষা করা যায়। ২৯ অক্টোবরের শুনানিতে সৌরভের পক্ষকে বলা হয়, ছবির কোন কোন দৃশ্যে তাঁর ব্যক্তিত্ব স্বত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে, সময় উল্লেখসহ তার তালিকা দিতে। পাশাপাশি আদালত সৌরভের অনুমোদিত বায়োপিকের চিত্রনাট্যও জমা দিতে নির্দেশ দেন।এরপর গতকাল মামলার অন্তর্বর্তী আবেদনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন বিচারপতি তেজস কারিয়া। আদালত প্রাথমিকভাবে মনে করেন, ছবিতে সৌরভের ব্যক্তিত্ব ও প্রচার স্বত্ব লঙ্ঘনের উপাদান রয়েছে। তবে ছবির গল্পের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের মুহূর্তগুলো এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে সেগুলো বাদ দেওয়া সহজ নয়। এ কারণে প্রদর্শন বন্ধের নির্দেশ দেননি আদালত।কিন্তু ছেড়েও দেননি। মামলা চলাকালে সৌরভের স্বার্থ সুরক্ষায় নির্মাতাদের দুই কোটি রুপির নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে বলেছেন আদালত। দুই সপ্তাহের মধ্যে তা জমা দিতে হবে আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে। সঙ্গে ছবির শুরুতে ও শেষে হিন্দি ও ইংরেজিতে যুক্ত করতে হবে একটি ঘোষণা। সেখানে জানাতে হবে, সৌরভের নাম ও পরিচিতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর সম্মতি নেওয়া হয়নি। এ নির্দেশ পালনের জন্য নির্মাতাদের সময় দেওয়া হয়েছে দুই দিন।তাই আপাতত সৌরভের আপত্তি সত্ত্বেও হলে চলবে ‘দুসরা’। তবে ছবির শুরুতে আর শেষে পর্দায় লেখা ভেসে উঠবে, এই নায়কের সম্মতি নেওয়া হয়নি।বাণিজ্যিক ব্যবহার আর ব্যক্তিত্ব স্বত্ব লঙ্ঘনের প্রশ্নে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় সৌরভ।
‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’–এ পুলিশের ভূমিকায় ‘দাদাগিরি’ সৌরভের





















