সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত
- প্রকাশের সময় : ১২:২২:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 13
সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে বিভিন্ন বিষয়ে তদবিরের চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে সরকারি দাপ্তরিক কাজে বিঘ্ন ঘটায় স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গণি। এতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ কয়েকজন সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি সচিবালয়ে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সাবেক আমলা ও সাধারণ মানুষের তদবিরের ভিড় বেড়েছে। চাকরি, বদলি, পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, স্থানীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং ইজারা পাওয়াসহ নানা দাবি নিয়ে প্রতিদিনই অনেকে সচিবালয়ে আসছেন।
সূত্রের দাবি, সচিবালয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও এসেছে। সম্প্রতি তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব জানান, সচিবালয়ে অতিরিক্ত মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। তিনি সচিবালয়ে এত বেশি মানুষের আগমন চান না। এতে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। তবে যৌক্তিক কারণে সভা, সেমিনারসহ প্রয়োজনীয় কাজে আগতদের প্রবেশের সুযোগ রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে এক সচিব জানান, সচিবালয়ে এত মানুষ কেন আসছেন এবং তারা কী উদ্দেশ্যে আসছেন, তা সম্প্রতি জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবরাও সেখানে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত যাতায়াত ও বিভিন্ন ধরনের তদবিরে মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য অনৈতিকভাবে কাউকে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন—এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়, কোনো গাড়িতে অননুমোদিত ব্যক্তি যেন সচিবালয়ে প্রবেশ করতে না পারেন। প্রতিটি গাড়ি ভালোভাবে তল্লাশি করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সংসদ সদস্য কিংবা সরকারি কর্মকর্তা—যেই হোন না কেন, প্রয়োজনীয় পাস বা অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে গাড়িতে করে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে পৃথক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন দর্শনার্থী যে মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজন ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয়ে যেন যেতে না পারেন, সে ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বৈঠকের পর সচিবালয় ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশের বিভিন্ন গেটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি গাড়ি প্রবেশের সময় তল্লাশি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত পাঁচ মাসে অনিয়মের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি ও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
এদিকে বর্তমানে সচিবালয়ে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়ে। সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে সরকারদলীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে তদবির করছেন বলে জানা গেছে। সংসদ সদস্যরাও নিয়মিত মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, রোববার দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন সংসদ সদস্য মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি কর্মদিবসে মন্ত্রীর অপেক্ষাকক্ষের পাশাপাশি করিডরেও বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল দেখা গেছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম উপজেলা কমিটি প্রস্তাব করেছে। পরে সেই তালিকা জেলা থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একজনকে চূড়ান্ত করবে মন্ত্রণালয়। কৃষিসচিব মো. সেলিম খান জানিয়েছেন, আগামী দুই-এক সপ্তাহের মধ্যে সার ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত হতে পারে। তবে তদবিরকারীদের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও তদবিরকারীদের উপস্থিতি বেড়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের যাতায়াত দেখা যাচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিয়োগ ও বরাদ্দের জন্য অনেকে তদবির করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পছন্দের হাসপাতালে পদায়ন কিংবা ঢাকায় থাকার জন্য চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, সব সরকারের সময়ই তদবিরকারীদের তৎপরতা থাকে। তারা সকালে এসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরে বেড়ান। সরকার কঠোর অবস্থান নিলে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।


















