দুনিয়ার কোনো সরকারই সুখে নেই

- প্রকাশের সময় : ০৯:০২:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 6

দুনিয়ার প্রায় সব দেশের মানুষ এখন বাজে সময় অতিক্রম করছে। যুদ্ধ লেগে আছে ইউরোপের রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ রাশিয়ার সঙ্গে পরাশক্তি আমেরিকার প্রক্সি লড়াই। যা চলছে চার বছরের বেশি সময় ধরে। যুদ্ধে রাশিয়া ইউক্রেনের এক বড় অংশ ইতোমধ্যে দখল করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার নামে আমেরিকা সে দেশের খনিজ সম্পদের ওপর প্রতিষ্ঠা করেছে নিজের অধিকার। বিশ্বের অন্যতম খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ ইউক্রেনের মানুষ যুদ্ধের কারণে ক্ষুধায় আক্রান্ত হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে লাখ লাখ ইউক্রেনবাসী। এ যুদ্ধের কারণে আমেরিকার অবরোধের মুখে পড়েছে রাশিয়া। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ যুদ্ধের আগে ছিল রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। সে দেশগুলোর অর্থনীতি চার বছর ধরে ঝুঁকিতে।
শুধু ইউরোপ নয়, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দুনিয়াজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে অনেক দেশ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছিল অর্থনৈতিক দুরবস্থার শিকার হয়ে। এ অভ্যুত্থানে সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হয়েছে। তারপরও মানুষের মনে স্বস্তি আসেনি বিশ্বজুড়ে বিরাজমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে। এ মন্দায় মার খেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিও। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত চার বছরে ৮০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ মাত্র কয়েক বছর আগেও ছিল বিশ্বের অন্যতম উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ। একদিকে ইউক্রেন অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-সংঘাতে প্রবৃদ্ধির হার অর্ধেকে নেমেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত দিক থেকে অভিন্ন জাতি। দুই দেশের শত শত বছরের ইতিহাসও অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের রুশপন্থি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুৎ করা হয় আমেরিকার ইন্ধনে। তারপর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়। প্রতিশোধ নিতে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে। শত শত বছর ধরে ক্রিমিয়া ছিল রাশিয়ার অংশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের পর রাশিয়ার এ অংশটি ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ ব্যাপারে রাশিয়ার কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ সে সময় রুশরাই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্তা। ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় মূলত রাশিয়ার কারণে। তারা ১৪টি দেশের দায় বছরের পর বছর বহন করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরও রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্বের। কৌতুক অভিনেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি ক্ষমতায় আসার পর ইউক্রেন আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগদানের চেষ্টা করে। সংগত কারণেই রাশিয়া এটিকে নিজেদের জন্য বিপদ বলে ভাবে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু থেকে দুই দেশ পরিণত হয় ঘোরতর শত্রুতে।
বিশ্বের অন্যতমইউক্রেনের ওপর রাশিয়া যে প্রথম আঘাত হানে তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ২০১৪ সালে তারা ক্রিমিয়া দখল করে। ২০২২ সালে সরাসরি চড়াও হয় ইউক্রেনের ওপর। যুদ্ধে আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা উদারভাবে সাহায্য করে ইউক্রেনকে। দুই দেশের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তি। এ যুদ্ধ দুদেশের মানুষের দুর্ভাগ্যই শুধু নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি দুনিয়াজুড়ে যে মন্দা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ভেঙে পড়েছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি। কোটি কোটি মানুষ বেকারত্বের শিকার হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বহাল থাকতেই মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম সর্বকালের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এ সংঘাত অব্যাহত থাকতেই ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের সংকট বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য নেই।
দুই. সারা দুনিয়ায় আজ যে অশান্তি দানা বেঁধে উঠেছে তার পেছনে রয়েছে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সংকট। ভোগবিলাস ও যুদ্ধাস্ত্রের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশটি এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। সে অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে তারা ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা দখল করেছে। সে দেশের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে নিজেদের দেশে বন্দি রেখেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপরাধ তিনি তাঁর দেশের সম্পদ শ্যামচাচাদের হাতে তুলে দিতে রাজি হননি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ হানাহানি সৃষ্টির পাশাপাশি ধর্মীয় বিদ্বেষও ছড়াচ্ছে ওয়াশিংটনের প্রভুরা। ইসলাম ফোবিয়ায় ভুগছে তারা। একসময় পুঁজিবাদীরা সবকিছুতে দেখত কমিউনিস্ট ভূত। এখন দেখছে ইসলামিস্টদের।
তিন. যদি প্রশ্ন করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ কোনটি? এ প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করবেন এমন পণ্ডিত খুব একটা কম নয়। আমাদের একসময়ের প্রভু দেশ প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের নামও উচ্চারণ করবেন অনেকে। আমাদের দেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় কার্নিশে থাকা আর্জেন্টিনার নামও কেউ কেউ হয়তো উচ্চারণ করবেন। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা কমবেশি ঝুঁকিতে থাকলেও এর কোনোটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ নয়। বিশ্বের শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা তুলে ধরলে বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কে যারা খুব একটা খোঁজখবর রাখেন না, তারা ভিরমি খাবেন। বেশ কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমেরিকার অবস্থান। যে দেশের সরকারের ঋণের পরিমাণ ৪১ পয়েন্ট ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। যা তাদের জিডিপির ১২৭ শতাংশ। এক ট্রিলিয়ন অর্থ এক লাখ কোটি। সে অর্থে এক ট্রিলিয়ন ডলার সমান ১২৫ লাখ কোটি টাকা। আর ৪১.৪ ট্রিলিয়ন কোটি ডলার সমান বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৭৫ লাখ কোটি টাকা।
আমাদের ইউনূস স্যারের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫-২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের যে বাজেট হয় তার পরিমাণ ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে আমেরিকা সরকারের মোট ঋণ বাংলাদেশের ৬৫৫ বছরের বাজেটের সমান।
গ্রেট ব্রিটেন আমাদের উপমহাদেশের মানুষকে ২০০ বছর ধরে শাসন করেছে। সে দেশের সরকারের ঋণের পরিমাণ ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। ইউরোপের অন্যতম সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ফ্রান্স সরকারের ঋণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার।জিডিপির সাড়ে ১১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ তথ্যটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। ঋণগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। সরকারের ঋণ ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ৪০ শতাংশ। এর অর্ধেকের বেশি বৈদেশিক ঋণ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ১০৩ বিলিয়ন থেকে ১০৪.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১০.৯ থেকে ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
বিশ্বের দেশে দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পেছনে কাজ করছে যুদ্ধ ও হানাহানির কারণে সৃষ্ট বিশ্বমন্দার ঘটনা। ভারতে নজিরবিহীন বিক্ষোভে রাজপথে নেমেছেন লাখ লাখ তরুণ-তরুণী। মোদি সরকার প্রথমবারের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও করছে তারা। পাকিস্তানও ফুঁসছে বিক্ষোভের আগুনে। ইমরান খানকে জেলে ভরে তাঁর জনপ্রিয়তাকেই অপ্রতিরোধ্য করে তুলছে শাহবাজ শরিফের ‘পরজীবী’ সরকার। জনগণ নয় সেনাবাহিনী তাদের ক্ষমতায় থাকার ভরসা। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরেও প্রথমবারের মতো তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছে।
ইউরোপের ধনী দেশ ফ্রান্স পুড়ছে বিক্ষোভের আগুনে। জীবনজীবিকায় পরাস্ত মানুষ রাজপথে নেমেছে দাবি আদায়ে। স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, বেলজিয়ামের মানুষও জীবনজীবিকার সংগ্রামে পরাস্ত হচ্ছে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে। দুনিয়াজুড়ে আজ যে সংকট দানা বেঁধেছে তার পেছনে দায়ী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভোগবাদী নীতি। বিশ্বকে লুটপাট করার জন্য লালসা। ফলে দুনিয়ার কোনো দেশ ও সরকার সুখে নেই। স্বস্তিতে নেই।
পাদটীকা : বিশ্বজুড়ে হানাহানি ও ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টির পেছনে আমেরিকা দায় এড়াতে পারে না। বিষয়টি এখন সে দেশের বিবেককেও নাড়া দিচ্ছে। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। যাঁর বয়স এখন ৮০। ফ্লোরিডার একটি ছোট চার্চে দাঁড়িয়ে ২০ অক্টোবর ২০২৬ তিনি শোনান তাঁর মেয়ে চেলসির গল্প। চেলসি যখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী, তখন পবিত্র কোরআন পড়ে শেষ করেন। তারপর বাবার হাতে একটি পৃষ্ঠা তুলে দিয়ে বলেন, ‘বাবা, এটা পড়। ফ্লোরিডার ব্রাওয়ার্ড কাউন্টির Koinonia Worship Center-এ ‘Multiple Faiths, One Florida’ শীর্ষক আন্তধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিল ক্লিনটন। তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন, ধর্মের নামে মানুষকে হেয় করার সংস্কৃতিতে তিনি ক্লান্ত। তাঁর কথায়, ‘আমি ক্লান্ত, মানুষকে কেবল মুসলিম হওয়ার কারণে হেয় করা হচ্ছে দেখে।’ ক্লিনটনের কথাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়াজুড়ে। ক্লিনটনকন্যা চেলসি তখন স্কুলছাত্রী। কোনো পরীক্ষার জন্য নয়, নিছক জানার আগ্রহে তিনি হাতে তুলে নেন পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েন। ক্লিনটন মঞ্চে বলেন, মেয়ে পড়া শেষ করে তাঁকে একটি আয়াত পড়তে বলে। সেই আয়াতটি ছিল সুরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে, মানবজাতিকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে তারা একে অন্যকে জানতে পারে, চিনতে পারে। ঘৃণা করার জন্য নয়। বিল ক্লিনটন সেদিন আরও বলেন, ‘প্রতিটি ধর্মেই খারাপ মানুষ আছে, কারণ আমরা সবাই তো ত্রুটিপূর্ণ মানুষ।’ ভালোমন্দের এই সহজ সত্যটাই তিনি শিখেছেন তাঁর ১৫ বছর বয়সি মেয়ের কাছ থেকে।
-আমেরিকার সব মানুষেরই তা শেখা উচিত।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : sumonpalit@gmail.com



















