একটি রাস্তার অভাবে ঘরবন্দি দুই বোন, কষ্টের জীবন চার ভাই-বোনের

- প্রকাশের সময় : ০৮:১৭:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 6

বাইরের পৃথিবীটা তাঁদের কাছে যেন অনেক দূরের। ঘরের দরজা পেরিয়ে একটু মুক্ত বাতাসে বের হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেই সুযোগ নেই। চলার শক্তি নেই পায়ে, নেই হুইলচেয়ার নিয়ে বের হওয়ার মতো একটি রাস্তা। তাই বছরের পর বছর ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই কাটছে দুই বোনের জীবন। একই পরিবারের আরও দুই ভাইও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে লড়ছেন জীবিকার জন্য। চার সন্তানের এমন অসহায়ত্ব দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া যেন কিছুই করার নেই বৃদ্ধা মায়ের।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দীঘি ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামের মৃত হযরত আলী ও জহুরা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে চারজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাঁরা হলেন হাবিয়া (৬৪), মেহেরজান (৫৮), ইজ্জত আলী (৫২) ও সিরাজ আলী (৪৮)। তাঁদের মধ্যে দুই ভাই কোনোরকমে হাঁটাচলা করতে পারলেও দুই বোন অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না।
জন্মের সময় অন্য শিশুদের মতোই স্বাভাবিক ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সাত থেকে আট বছর বয়সে অসুস্থ হওয়ার পর একে একে চার সন্তানের জীবনে নেমে আসে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। বড় মেয়ে হাবিয়া জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর হাঁটাচলায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। কবিরাজের চিকিৎসা করিয়েও কোনো সুফল মেলেনি। একইভাবে অসুস্থতার পর শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় অন্য তিন সন্তানেরও।
সন্তানদের সুস্থ করে তোলার আশা পূরণ হয়নি মা জহুরা বেগমের। উল্টো তাঁদের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সমাজের মানুষের কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। সেই কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়ির বাইরে বের হইলে মাইনষে কত ঠাট্টার কথা কইছে! এহনও করে।’
প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী হযরত আলীর মৃত্যুতে সংসারের সংকট আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মচারী ছিলেন তিনি। স্বামীকে হারিয়ে চার প্রতিবন্ধী সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটছে জহুরা বেগমের।
একটি রাস্তার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা
হাবিয়া ও মেহেরজানের জীবনে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, ইচ্ছা থাকলেও ঘর থেকে বের হতে পারেন না তাঁরা। বাড়িতে যাতায়াতের নিজস্ব রাস্তা নেই। ভাটবাউর বাজারের পাকা সড়ক থেকে কয়েকটি বাড়ির ওপর দিয়ে যেতে হয় তাঁদের বাড়িতে। ফলে দুই বোনকে বাইরে নিতে হলে পরিবারের সদস্যদের কোলে করে বের করতে হয়। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।
একটি রাস্তা থাকলে অন্তত হুইলচেয়ারে করে ঘরের বাইরে বের হতে পারতেন তাঁরা। কিন্তু সেই সামান্য সুযোগটুকুও তাঁদের জীবনে অধরা।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টের কথা বলতে গিয়ে মেহেরজান বলেন, ‘আমাগো কষ্টের জীবনের খোঁজ কেউ নেন না। প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারের বোঝা মনে হয়। হুইলচেয়ারে করে কেউ বের করবে, হেই রাস্তাও নাই। আমাগো কষ্ট নানা দিকে।’
তাঁর এই কথায় ফুটে ওঠে শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার যন্ত্রণা নয়, অবহেলা আর অসহায়ত্বের বেদনাও।
অন্যদিকে দুই ভাই ইজ্জত আলী ও সিরাজ আলী শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাটবাউর বাজারের পাশে খোলা আকাশের নিচে ছোট দোকান চালিয়ে সামান্য আয় করেন তাঁরা। সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা ও জমির ফসলের আয় দিয়ে কোনোরকমে চলছে সংসার।
প্রায় দুই বছর আগে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় যাতায়াতের রাস্তা তৈরির জন্য কিছু মাটি ফেলা হয়েছিল। কিন্তু অর্থের অভাবে কাজ আর এগোয়নি। ফলে একটি রাস্তার অপেক্ষা আজও শেষ হয়নি পরিবারটির।
স্থানীয় সমাজসেবক আমজাদ হোসেন জানান, শুধু এই পরিবার নয়, আশপাশের অন্তত ১০টি পরিবারের যাতায়াতের নিজস্ব রাস্তা নেই। অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে চলাচল করতে হয় তাঁদেরও।
সহায়তার আশ্বাস, তবু কাটেনি দুর্ভোগ
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুশিয়া আক্তার জানান, প্রতিবন্ধী চার ভাই-বোনের প্রত্যেককে তিন মাস পরপর তিন হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দুই ভাইকে একটি ট্রাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য তাঁদের ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন জানান, পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। প্রতিবন্ধী পরিবারসহ আশপাশের বাসিন্দাদের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
এদিকে প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির আওতায় গত শনিবার পরিবারটিকে একটি সেলাই মেশিন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে প্রথম আলো বন্ধুসভা।
জীবনের দীর্ঘ সময় শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে পার করেছেন চার ভাই-বোন। তাঁদের চাওয়া বিলাসিতা নয়, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ। বিশেষ করে দুই বোনের জন্য একটি চলাচলের রাস্তা মানে শুধু যাতায়াতের সুবিধা নয়, ঘরের চার দেয়ালের বাইরে পৃথিবীটাকে দেখার সুযোগও।
সেই সুযোগ কবে মিলবে, আপাতত তারই অপেক্ষায় দিন কাটছে তাঁদের।


















