বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর নয় : হাইকোর্ট
- প্রকাশের সময় : ১১:৩৭:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 2
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তি দেওয়ার আগে শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র মাধ্যমে তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারবে না প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
অসদাচরণের অভিযোগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৭ জুলাই এ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গতকাল প্রকাশিত হয়েছে। রায়ের মূল অংশটি লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।
আদালত বলেছেন, বেসরকারি কলেজের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কোনো শিক্ষককে কারণ দর্শানোর যথাযথ সুযোগ না দিয়ে কিংবা শুধু মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত বরখাস্ত করা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজ নোটিশ দেয়। শিক্ষক লিখিত জবাবে তার বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে গভর্নিং বডি দ্বিতীয় দফায় শোকজ নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শিক্ষক আবারও লিখিত জবাবে অভিযোগ অস্বীকার করেন। এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তদন্ত কমিটি মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, যা নিয়মসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়নি। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর দেখানো হয়।
পরে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হয়। একই বছরের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় কমিটি গভর্নিং বডির বরখাস্তের প্রস্তাব নামঞ্জুর করে শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়।
এ সিদ্ধান্ত কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হয়। তবে শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।
এরপর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। রিটের পর আদালত রুল জারি করে বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করেন। একই সঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন আদালত।
রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেন, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত বা অপসারণ কার্যকর করা যাবে না। বোর্ডের অনুমোদনের আগেই গচিহাটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে আইনি এখতিয়ার অগ্রাহ্য করেছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
তবে মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুর অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।
আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসরের তারিখ পর্যন্ত শিক্ষক তার প্রাপ্য সব বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাবেন। শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে আদালতের এ সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।










