ডাকসু নির্বাচন: ক্যাম্পাস রাজনীতির রূপান্তরের আখ্যান
- প্রকাশের সময় : ০৮:৪৫:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 406
স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ছিল একেবারেই ভিন্ন, শিক্ষণীয় এবং আদর্শমুখী। তখন নেতৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল মেধা, অধ্যবসায়, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা। দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি সচেতনতা সৃষ্টির এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত। হলে হলে মনোনয়ন দেওয়ার সময় প্রথমেই খোঁজা হতো—কে ভালো ছাত্র, কে ভদ্র, কে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় বা কে নেতৃত্বের যোগ্য। সাধারণ ছাত্ররা তখন মেধাবী ও আলোকিত ছাত্রদের প্রতি আস্থা রাখত এবং তাদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করত।
সেই সময়কার ছাত্রনেতারা কেবল শিক্ষাঙ্গনেই অবদান রাখেননি; তাঁরা প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ক্ষেত্র ও রাষ্ট্রীয় সেবায়ও সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। এমনকি জাতীয় রাজনীতিতেও অনেক সাবেক ছাত্রনেতা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বলা যায়, ছাত্র রাজনীতি ছিল ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গঠনের এক প্রশিক্ষণক্ষেত্র, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্যও অবদান রেখেছে।
কিন্তু আশির দশক থেকে চরিত্রে পরিবর্তন দেখা যায়। নব্বইয়ের দশকে ছাত্র রাজনীতি রূপ নেয় একধরনের ‘হিরোইজমে’। তখন মেধার চেয়ে দাপট, প্রভাব ও ভয় প্রদর্শন নেতৃত্বের মানদণ্ডে পরিণত হয়। ক্যাম্পাসে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সেইসব ছাত্রনেতা, যাদের জনপ্রিয়তা পড়াশোনার কৃতিত্বে নয়, বরং প্রভাব প্রদর্শনের ক্ষমতায়। জনপ্রিয় সাময়িকীগুলোতেও তাদেরকে ‘হিরো’ হিসেবে প্রচার করা হতো। ফলে পড়াশোনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মেধাবী ও ভদ্র ছাত্ররা নেতৃত্ব থেকে সরে যায় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতিভীতি বাড়তে থাকে। হলে হলে সিট বণ্টন, গণরুম, গেস্টরুম—এসব হয়ে ওঠে আতঙ্কের প্রতীক।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্ম আর অন্ধভাবে কাউকে ‘হিরো’ মানতে রাজি নয়। তারা প্রশ্ন করছে, প্রতিবাদ করছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের হাতে এনে দিয়েছে নতুন শক্তি। ক্যাম্পাসের যেকোনো অন্যায় তারা মুহূর্তেই প্রকাশ্যে আনতে পারছে। এতে ভয় দেখিয়ে নেতৃত্ব দখলের সুযোগ অনেকটাই কমেছে এবং যোগ্য নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া বিকল্প প্যানেল ও ছাত্র শিবির ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে—নির্যাতিত ছাত্রদের জন্য মেসের ব্যবস্থা করা, টিউশনের সুযোগ করে দেওয়া, আর্থিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব উদ্যোগ সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবন সহজ করেছে এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে।
এবারের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্ররা ছাত্রদলকে ছাত্রলীগের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেছে। তাদের ধারণা ছিল, ছাত্রদল জিতলে আবারও গণরুম, জোরপূর্বক মিছিলে অংশগ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের রাজনীতি ফিরে আসবে। অপরদিকে নির্দলীয় বা বিকল্প প্যানেলগুলোকে দুর্বল মনে হয়েছে—যারা হয়তো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। ফলে ছাত্ররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: ছাত্র রাজনীতি করতে হলে ভালো ছাত্র হতে হবে, নরম ভাষায় কথা বলতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের বিজয় এরই প্রমাণ। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ফল। তারা বিগত সরকারের সময়ে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে হলে হলে ছোট পরিসরে কার্যক্রম চালিয়েছে। বিরূপ পরিস্থিতিতেও তারা সংগঠিত থেকেছে এবং হলে অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। পক্ষান্তরে ছাত্রদল ছাত্রলীগের রোষাণলে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ছিল, ফলে তারা কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কাছে প্রস্তুতিহীন ছাত্রদল টিকতে পারেনি।
১৯৫২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত জাতির সংকটময় মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের সংগ্রামই স্বাধীনতা, ন্যায় ও গণতন্ত্রের পথকে সুদৃঢ় করেছে। আজকের ছাত্ররা আর হিরো বানানো নেতার অন্ধ অনুসারী নয়; তারা নিজেদের অধিকার, স্বাধীন চিন্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সরব।
যদি এই ধারা বজায় থাকে, তবে আবারও মেধাবী, ভদ্র, সৎ ও আলোকিত ছাত্রদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি হবে। ছাত্র রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তা হতে হবে ইতিবাচক, সৃজনশীল ও গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে। হিরোইজমের জায়গা নিতে হবে মেধা, সততা ও মানবিকতার।
অতএব, ছাত্র রাজনীতি আর কোনো দলের লেজুবৃত্তি নয়; এটি হতে হবে সত্যিকার অর্থেই ছাত্রদের কল্যাণ ও স্বার্থে। সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, নতুন চাহিদার আলোকে, ছাত্র রাজনীতি কেবল ক্যাম্পাসের জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও দায়বদ্ধ। এখানে ডারউইনের “ঝঁৎারাধষ ড়ভ ঃযব ভরঃঃবংঃ” মতবাদ প্রাসঙ্গিক—যারা যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়ের পথে নেতৃত্ব দেবে, তারাই টিকে থাকবে। যারা অন্যায়ের পথে নেতৃত্বের চেষ্টা করবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে যাবে।
নতুন প্রজন্ম চাইছে এমন নেতৃত্ব, যা প্রেরণা যোগায়, উদ্যম জাগায় এবং সত্যিকার অর্থে উন্নতির পথ তৈরি করে। তাই ছাত্রদের প্রতি আহ্বান—নিজের অধিকার জানুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী হোন এবং মেধা ও সততার পথে নেতৃত্ব দিন। এ পথই আগামী দিনের শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও মানবিক নেতৃত্বের ভিত্তি স্থাপন করবে।
একইসঙ্গে ছাত্রদল ও অন্যান্য দলের কর্মীদেরও নতুন করে ভাবতে হবে। কোনোভাবেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। নিজেদের পড়ালেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে এবং অন্ধ দলীয় রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে হবে। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরা যে আদর্শের কথা মুখে বলেন, সেই আদর্শ নিজেদের আচরণ ও কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। তাহলেই সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রতি আস্থা রাখবে এবং ছাত্র রাজনীতিও ফিরে পাবে তার ইতিবাচক চরিত্র।
ছাত্রশিবির আদর্শভিত্তিক, কমান্ড ও ক্যাডার ভিত্তিক দল। তারা প্রমাণ করেছে, কমান্ড মেনে চললে সুফল অনিবার্য। তাই অন্যান্য দলকেও নিজেদের দলীয় কমান্ড মেনে চলতে শিখতে হবে। তাদের মোকাবিলা করতে হলে, ছাত্রদল ও ছাত্রলীগকেও নিজেদের আদর্শ ও কাজের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। কেবল প্রভাব বা ভয় দেখানো দিয়ে নয়।
অতীতের ন্যায় ও গৌরবকে পুনরায় উজ্জ্বল করতে হলে, উদার ও গণতান্ত্রিক দলগুলোকে নিজেদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে হবে। এর ফলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, সৃজনশীল এবং দায়িত্বশীল পরিবেশ তৈরি হবে। সত্যিকার অর্থে মেধা, সততা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ছাত্র রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এতে আগামী প্রজন্ম পাবে এমন নেতৃত্ব, যারা উদ্ভাবনী, ন্যায়পরায়ণ এবং সকল শিক্ষার্থীর কল্যাণের জন্য কাজ করবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।
ইমেইল : mmrrajbari71@gmail.com


























