Dhaka ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প

মোঃ হামজা শেখ, কালুখালী থেকে
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৫৩:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ জুলাই ২০২৫
  • / 149

এক সময় রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নে সকাল শুরু হতো তাঁতের শব্দে। টুক টুক করে বাজতো কাঠের সাঁড়াশির মতো তাঁত মেশিন। শত শত পরিবার জীবিকার উৎসব ছিল এ শিল্প। তাঁত শুধু জীবিকা ছিলনা, ছিল সংস্কৃতি, ছিল পরিচয়। কিন্তু সময় বদলে গেছে। বদলে গেছে জীবনের গতি। আজ এই ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প বিলুপ্তির মুখে। ব্যয়বহুল হাতে তৈরি তাঁতের শাড়ি আজ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তাঁতিরা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য। নেই সঠিক বিপণন ব্যবস্থা। যন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে হাতের শিল্প। যেখানে এক সময় শত শত তাঁত কাজ করত। এখন হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। বর্তমান সময়ে লুঙ্গি, গামছা তৈরির সুতা এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিসহ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বন্ধ হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতশিল্প। এর ফলে তাঁতিরা এখন তাদের পেশা ছেড়ে দিয়ে প্রবাসে চলে যাচ্ছেন। নয়তো অন্য কোন পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। আর নতুন প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কারণ এই পেশায় ভবিষ্যৎ নেই নিশ্চয়তা নেই।

কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের চরচিলোকা গ্রামের তাঁত শ্রমিক রফিকুল বিশ্বাস (৫৫) বলেন, আমার জন্মের পর থেকেই এই কাজ দেখে আসছি। এই কাজ আমার দাদা করতোন। আমার বাবা করতেন। এখন আমিও করি। ৩০/৩৫ বছর আগে খুব ভালো চলতো। এখন আর সেরকম চলে না। আগে চারটা গামছা বানালে ১৫০ টাকা আয় হতো। এখন ১০০ টাকা হয়। এখন এই কাজ  প্রায় সবাই বাদ দিয়ে দিচ্ছে। এই গ্রামে আগে প্রায় ২শ লোক এই কাজ করতো। এখন ৮/১০ জন এই কাজ করে। এখন কেউ কৃষি কাজ করে, কেউ ভ্যান চালায় কেউ আবার বিদেশ চলে গেছে। এখন অনেকেই বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে এই কাজ করে, কিন্তু আমাদের তো সামর্থ্য। একটা মেশিনের দাম দুই লক্ষ টাকা।

তাঁত শ্রমিক  নুরুজ্জামান মিয়া (৪৫) জানান, বাপ দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসতেছি। এটা আমাদের জাতি ব্যবসা। তবে এই কাজ করে আমরা ভালো নেই। একজন দিন মজুরও দিনে ৫০০/৭০০ টাকা ইনকাম করে আর আমরা ইনকাম করি ৩০০ টাকা। তারপর সুতা ও রংয়ের দাম অনেক বেশি। সরকার যদি এদিকে একটু নজর দিত তাহলে আমরা স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলতে পারতাম।

এ বিষয়ে কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহুয়া আফরোজ বলেন, তাঁত শিল্প বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। এটি এদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে জড়িত। একটা সময় দেশের অনেক মানুষ এই শিল্প নিয়ে কাজ করতো। কালুখালীতেও একটা বড় জনগোষ্ঠী তাঁত শিল্প নিয়ে কাজ করতো। তবে এখন সেই সংখ্যা খুবই সীমিত । আমরা ইতিমধ্যে তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি, কালুখালী উপজেলার মৃগী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নে কিছু লোক এখনও এই পেশার সাথে জড়িত। তাদের সাথে আমরা কথা বলেছি, তাদের কে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে কাজ করছি। এখন সবাই বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে কাজ করছে। যাদের বৈদ্যুতিক মেশিন নেই, তারা হাত দিয়ে চালিত মেশিন দিয়ে কাজ করছে, তাদের কেও বৈদ্যুতিক মেশিন দেওয়ার একটা পরিকল্পনা করছি। ঐতিহ্য এই পেশাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কালুখালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যা কিছু করা সম্ভব আমরা সেগুলোই করার চেষ্টা করছি।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৩:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ জুলাই ২০২৫

এক সময় রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নে সকাল শুরু হতো তাঁতের শব্দে। টুক টুক করে বাজতো কাঠের সাঁড়াশির মতো তাঁত মেশিন। শত শত পরিবার জীবিকার উৎসব ছিল এ শিল্প। তাঁত শুধু জীবিকা ছিলনা, ছিল সংস্কৃতি, ছিল পরিচয়। কিন্তু সময় বদলে গেছে। বদলে গেছে জীবনের গতি। আজ এই ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প বিলুপ্তির মুখে। ব্যয়বহুল হাতে তৈরি তাঁতের শাড়ি আজ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তাঁতিরা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য। নেই সঠিক বিপণন ব্যবস্থা। যন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে হাতের শিল্প। যেখানে এক সময় শত শত তাঁত কাজ করত। এখন হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। বর্তমান সময়ে লুঙ্গি, গামছা তৈরির সুতা এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিসহ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বন্ধ হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতশিল্প। এর ফলে তাঁতিরা এখন তাদের পেশা ছেড়ে দিয়ে প্রবাসে চলে যাচ্ছেন। নয়তো অন্য কোন পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। আর নতুন প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কারণ এই পেশায় ভবিষ্যৎ নেই নিশ্চয়তা নেই।

কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের চরচিলোকা গ্রামের তাঁত শ্রমিক রফিকুল বিশ্বাস (৫৫) বলেন, আমার জন্মের পর থেকেই এই কাজ দেখে আসছি। এই কাজ আমার দাদা করতোন। আমার বাবা করতেন। এখন আমিও করি। ৩০/৩৫ বছর আগে খুব ভালো চলতো। এখন আর সেরকম চলে না। আগে চারটা গামছা বানালে ১৫০ টাকা আয় হতো। এখন ১০০ টাকা হয়। এখন এই কাজ  প্রায় সবাই বাদ দিয়ে দিচ্ছে। এই গ্রামে আগে প্রায় ২শ লোক এই কাজ করতো। এখন ৮/১০ জন এই কাজ করে। এখন কেউ কৃষি কাজ করে, কেউ ভ্যান চালায় কেউ আবার বিদেশ চলে গেছে। এখন অনেকেই বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে এই কাজ করে, কিন্তু আমাদের তো সামর্থ্য। একটা মেশিনের দাম দুই লক্ষ টাকা।

তাঁত শ্রমিক  নুরুজ্জামান মিয়া (৪৫) জানান, বাপ দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসতেছি। এটা আমাদের জাতি ব্যবসা। তবে এই কাজ করে আমরা ভালো নেই। একজন দিন মজুরও দিনে ৫০০/৭০০ টাকা ইনকাম করে আর আমরা ইনকাম করি ৩০০ টাকা। তারপর সুতা ও রংয়ের দাম অনেক বেশি। সরকার যদি এদিকে একটু নজর দিত তাহলে আমরা স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলতে পারতাম।

এ বিষয়ে কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহুয়া আফরোজ বলেন, তাঁত শিল্প বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। এটি এদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে জড়িত। একটা সময় দেশের অনেক মানুষ এই শিল্প নিয়ে কাজ করতো। কালুখালীতেও একটা বড় জনগোষ্ঠী তাঁত শিল্প নিয়ে কাজ করতো। তবে এখন সেই সংখ্যা খুবই সীমিত । আমরা ইতিমধ্যে তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি, কালুখালী উপজেলার মৃগী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নে কিছু লোক এখনও এই পেশার সাথে জড়িত। তাদের সাথে আমরা কথা বলেছি, তাদের কে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে কাজ করছি। এখন সবাই বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে কাজ করছে। যাদের বৈদ্যুতিক মেশিন নেই, তারা হাত দিয়ে চালিত মেশিন দিয়ে কাজ করছে, তাদের কেও বৈদ্যুতিক মেশিন দেওয়ার একটা পরিকল্পনা করছি। ঐতিহ্য এই পেশাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কালুখালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যা কিছু করা সম্ভব আমরা সেগুলোই করার চেষ্টা করছি।