রাজশাহী মেডিকেলে ডেঙ্গুতে ৯ মাসে ভর্তি ৯০১, মৃত্যু ১৩
- প্রকাশের সময় : ১২:৩১:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 5
চলতি বছরের (২০২৬ সাল) ৯ মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৯০১ জন রোগী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরমধ্যে ৮০২ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৩ জন। আর বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮৬ জন রোগী।
ডেঙ্গু রোগীদের সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় অংশই প্রাপ্তবয়স্ক। মোট ৯০১ জন রোগীর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ৮৩৩ জন। যা মোট রোগীর প্রায় ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে শিশু রোগীর সংখ্যা ৬৮ জন। যা মোট রোগীর প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যেও পুরুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মোট ৮৩৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর মধ্যে পুরুষ ৬১০ জন, এবং নারী ২২৩ জন। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের প্রায় ৭৩ শতাংশই পুরুষ। নারী রোগীর হার প্রায় ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে, মোট ৬৮ শিশু ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয়েছে। অর্থাৎ হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের চাপই অনেক বেশি ছিল।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু আগস্ট মাসে বিভাগের আট জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আক্রান্ত ৬৪৩ জন, সিরাজগঞ্জে ৩৬৩ জন, বগুড়ায় ১৬৫ জন, নওগাঁয় ৪১ জন, নাটোরে ৫৬ জন, পাবনায় ৪২ জন, রাজশাহীতে ২৫ জন ও জয়পুরহাটে ৪ জন আগস্টজুড়ে আক্রান্ত হয়ে সেবা নিয়েছেন। অপরদদিকে, বিভাগের তিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২৮ জন। এরমধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৮ জন এবং সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১৯ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
বেশি রোগী চিকিৎসা নেওয়া রামেক হাসপাতালের আগস্ট মাসের ডেঙ্গু পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাসের শুরুতে হাসপাতালে ডেঙ্গুতে চিকিৎসাধীন রোগী ছিলেন ৮ জন, যা ৩০ আগস্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। অর্থাৎ এক মাসে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪২ জন বা ৫২৫ শতাংশ। ১ থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে ২৫ আগস্টের তথ্য বাদে মোট ২৯ দিনের হিসাবে নতুন করে ২২১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৭৬ জন। ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে দুইজনের।
ছাড়পত্র ও মৃত্যর হার
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের (২০২৬ সাল) ৯ মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপে ৯০১ জন রোগী রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ৮০২ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এই সংখ্যা মোট রোগীর প্রায় ৮৯ শতাংশ। মোট ভর্তি রোগী থেকে ছাড়পত্র পাওয়া রোগী ও মৃতের সংখ্যা বাদ দিলে হিসাব অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকার কথা। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে গেলেও ডেঙ্গুর রোগী ভর্তি অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরে মোট ৯০১ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট ভর্তি রোগীর তুলনায় মৃত্যুর হার প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। বেশির ভাগ রোগীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে মৃত্যুর ঘটনা মোট রোগীর তুলনায় কম হলেও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা রোগটির ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনছে। বিশেষ করে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে এলে বা জটিলতা তৈরি হলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
পুরুষ রোগীর আধিক্য
পরিসংখ্যানে ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় প্রায় তিনগুণ। ৮৩৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর মধ্যে ৬১০ জন পুরুষ, বিপরীতে নারী ২২৩ জন।তবে শুধু এই হাসপাতালের ভর্তি-পরিসংখ্যান দিয়ে পুরুষদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার প্রকৃত ঝুঁকি নারীদের তুলনায় বেশি—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। বাইরে চলাফেরা, কর্মস্থলে অবস্থান, মশার সংস্পর্শ, চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসার প্রবণতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও আচরণগত কারণ এ ব্যবধানের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে আলাদা গবেষণা বা জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বরেই বাড়ছে চাপ
সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক দৈনিক হিসাবগুলোও হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপের ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে। একদিকে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্রও পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে শুধু মোট রোগীর সংখ্যা দিয়ে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। প্রতিদিন কতজন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, কতজন সুস্থ হচ্ছেন, কতজন চিকিৎসাধীন থাকছেন এবং কতজন জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন—এসব সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই প্রকোপের প্রকৃত গতিপথ বোঝা সম্ভব।
সর্বশেষ এক সপ্তাহের চিত্র
হাসপাতালটিতে এক সপ্তাহে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৯৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৯৩ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন পাঁচজন। মৃতদের মধ্যে কিশোরী, কৃষক, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ রয়েছেন। রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১৯-২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন যথাক্রমে ২০, ৩১, ২৬, ২৯, ২৪, ৪২ ও ২৫ জন। এ হিসাবে সপ্তাহে মোট নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ১৯৭ জন।
অন্যদিকে, একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১২, ১৮, ২৭, ২৫, ২৫, ৪৬ ও ৪০ জন। অর্থাৎ সাত দিনে মোট ১৯৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এই এক সপ্তাহে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর মো. আনোয়ার মন্ডল (৫২) নামে তানোরের এক ব্যক্তি মারা যান। পরদিন ২০ সেপ্টেম্বর মারা যান বাঘমারার ১৬ বছর বয়সী সাথী রাণী। ২২ সেপ্টেম্বর আব্দুল করিম (৪৫) নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক কৃষকের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর মোসা. নাসরিন (৩০) নামে রাজশাহীর বোয়ালিয়ার এক চাকরিজীবীর মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। ২১ সেপ্টেম্বরও একজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে হাসপাতালের দেওয়া তথ্যে তার মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। মৃতদের মধ্যে আনোয়ার মন্ডল, সাথী রাণী ও নাসরিনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম উল্লেখ করা হয়েছে। নাসরিন ২০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মারা যান। তিনি প্রথমে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন, পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়।
এক সপ্তাহের দৈনিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৪ সেপ্টেম্বর রামেকে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি—৪২ জন। এর আগের দিন ভর্তি হন ২৪ জন এবং ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে ভর্তি হন ২৫ জন। ২৫ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালে ডেঙ্গুতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ জন। এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর এই সংখ্যা ছিল ১০৭ জন, যা সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী তিন দিনে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা কমে ৮৬ জনে নেমেছে। তবে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি ও রোগী ছাড়পত্র পাওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটায় হাসপাতালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, নাসরিনের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর বিপরীতে ৪০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। হাসপাতালে ৮৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।



















