Dhaka ০৯:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
বেসরকারি খাত ও সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষক মধুখালীর মনিরুল ইসলাম মালয়েশিয়ায় ‘যেমনে-তেমনে’ কর্মী পাঠানো যাবে না: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক কর্মশালা কোটালীপাড়ায় শিশু কল্যাণ বোর্ডের অর্ধবার্ষিক সভা সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে স্বচ্ছতা আনতে লটারি পদ্ধতি চালু : আইনমন্ত্রী বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতোর মালা, নিন্দা ও ক্ষোভ ‘জ্বালানি তেলের দাম কমে স্থিতিশীল হলে সমন্বয়ের কথা ভাববে সরকার’ ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড ১০ জনের মৃত্যু বাংলাদেশিদের শ্রম ভিসা সাময়িক বন্ধ করল লাওস

বেনাপোল বন্দরে পণ্য পাচার ও শুল্ক ফাঁকি: আরও দুই মামলায় ২৪ আসামি

বেনাপোল প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : ০৬:২৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
  • / 152

বেনাপোল স্থলবন্দরের শেড থেকে আমদানিকৃত পণ্য পাচার ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে আরও দুটি মামলা দায়ের করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। নতুন এ দুই মামলায় বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি এবং আমদানিকারকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

এর আগে একই ধরনের অভিযোগে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল। ফলে গত এক সপ্তাহে দায়ের হওয়া তিনটি মামলায় মোট ৪৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ৭ জুন ভারত থেকে ৩২৬ কার্টুন কালার পেন্সিল, ওয়াটার কালার পেন্সিল ও ইরেজারের একটি চালান বেনাপোল বন্দরের ২৬ নম্বর শেডে আসে। ভারতের কোহিনুর এক্সপোর্টের রপ্তানি করা ওই চালানের আমদানিকারক ছিল যশোরের শার্শা উপজেলার টিএস ইন্টারন্যাশনাল।

পরিদর্শনের সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা বৈধ পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০ কার্টুন ঘোষণাবহির্ভূত উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করেন। এর মধ্যে ছিল ৩০ কার্টুন উচ্চমূল্যের ভারতীয় শাড়ি এবং ২০ কার্টুন ফেসওয়াশ। এসব পণ্যের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ কাস্টমসের।

এদিকে গত ১২ মার্চ ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি চালানে ‘বেকিং পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে প্রায় ছয় কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস আনার অভিযোগ ওঠে শাফা ইমপেক্সের বিরুদ্ধে। কাস্টমস পণ্যগুলো জব্দ করে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সংরক্ষণ করে। কিন্তু কোরবানির ঈদের ছুটির সময় বন্দরের জিম্মায় থাকা সেই চালান থেকে রহস্যজনকভাবে দামি ভারতীয় পণ্য উধাও হয়ে যায়। পরে সেখানে নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি ও অন্যান্য পণ্য পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব পরিশোধের জন্য নোটিশ দিয়েছে কাস্টমস। একই সঙ্গে শেড ইনচার্জকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এর আগে ঢাকার নুসরাত ট্রেডিংয়ের একটি চালানে ‘সিনথেটিক ফেব্রিক্স অ্যান্ড লেস’ ঘোষণা দেওয়া হলেও কাস্টমস ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) অভিযানে ঘোষণাবহির্ভূত ৬৭৯টি ভারতীয় শাড়ি জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় প্রায় এক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

এ ছাড়া বন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকেও ২৫ মেট্রিক টন পণ্য পাচার ও বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

এসব ঘটনায় গত ১৪ জুন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ও কাজী নাঈম উদ্দীন পৃথক দুটি মামলায় ২৪ জনকে আসামি করে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করেন। এর আগে ৯ জুন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহমুদুল আরেফিন আরও একটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করেন।

বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বন্দর, কাস্টমস বা ব্যবসায়ী—অপরাধে জড়িত যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, বন্দরের শেড থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল পোর্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বলেন, তিনটি মামলার আসামিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরাও। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, বন্দরের প্রতিটি শেডে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। ভেতরের সহযোগিতা ছাড়া কয়েক কোটি টাকার পণ্য সরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব। জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাইদ আহমেদ রুবেল জানান, গত কয়েক মাসে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির অভিযোগে ১৪টি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব চালানের মাধ্যমে প্রায় ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

বেনাপোল বন্দরে পণ্য পাচার ও শুল্ক ফাঁকি: আরও দুই মামলায় ২৪ আসামি

প্রকাশের সময় : ০৬:২৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

বেনাপোল স্থলবন্দরের শেড থেকে আমদানিকৃত পণ্য পাচার ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে আরও দুটি মামলা দায়ের করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। নতুন এ দুই মামলায় বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি এবং আমদানিকারকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

এর আগে একই ধরনের অভিযোগে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল। ফলে গত এক সপ্তাহে দায়ের হওয়া তিনটি মামলায় মোট ৪৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ৭ জুন ভারত থেকে ৩২৬ কার্টুন কালার পেন্সিল, ওয়াটার কালার পেন্সিল ও ইরেজারের একটি চালান বেনাপোল বন্দরের ২৬ নম্বর শেডে আসে। ভারতের কোহিনুর এক্সপোর্টের রপ্তানি করা ওই চালানের আমদানিকারক ছিল যশোরের শার্শা উপজেলার টিএস ইন্টারন্যাশনাল।

পরিদর্শনের সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা বৈধ পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০ কার্টুন ঘোষণাবহির্ভূত উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করেন। এর মধ্যে ছিল ৩০ কার্টুন উচ্চমূল্যের ভারতীয় শাড়ি এবং ২০ কার্টুন ফেসওয়াশ। এসব পণ্যের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ কাস্টমসের।

এদিকে গত ১২ মার্চ ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি চালানে ‘বেকিং পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে প্রায় ছয় কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস আনার অভিযোগ ওঠে শাফা ইমপেক্সের বিরুদ্ধে। কাস্টমস পণ্যগুলো জব্দ করে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সংরক্ষণ করে। কিন্তু কোরবানির ঈদের ছুটির সময় বন্দরের জিম্মায় থাকা সেই চালান থেকে রহস্যজনকভাবে দামি ভারতীয় পণ্য উধাও হয়ে যায়। পরে সেখানে নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি ও অন্যান্য পণ্য পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব পরিশোধের জন্য নোটিশ দিয়েছে কাস্টমস। একই সঙ্গে শেড ইনচার্জকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এর আগে ঢাকার নুসরাত ট্রেডিংয়ের একটি চালানে ‘সিনথেটিক ফেব্রিক্স অ্যান্ড লেস’ ঘোষণা দেওয়া হলেও কাস্টমস ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) অভিযানে ঘোষণাবহির্ভূত ৬৭৯টি ভারতীয় শাড়ি জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় প্রায় এক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

এ ছাড়া বন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকেও ২৫ মেট্রিক টন পণ্য পাচার ও বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

এসব ঘটনায় গত ১৪ জুন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ও কাজী নাঈম উদ্দীন পৃথক দুটি মামলায় ২৪ জনকে আসামি করে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করেন। এর আগে ৯ জুন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহমুদুল আরেফিন আরও একটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করেন।

বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বন্দর, কাস্টমস বা ব্যবসায়ী—অপরাধে জড়িত যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, বন্দরের শেড থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল পোর্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বলেন, তিনটি মামলার আসামিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরাও। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, বন্দরের প্রতিটি শেডে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। ভেতরের সহযোগিতা ছাড়া কয়েক কোটি টাকার পণ্য সরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব। জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাইদ আহমেদ রুবেল জানান, গত কয়েক মাসে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির অভিযোগে ১৪টি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব চালানের মাধ্যমে প্রায় ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।