কেমনে ভুলিব তোমারে  (প্রবাদ প্রতিম নায়ক ও অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্মরনে)

 

ডাঃসুনীল কুমার বিশ্বাস

বিশ্বনন্দিত কিংবদন্তি নায়ক তুমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ৮৫ বছর বয়সে সর্বগ্রাসী করোনা আর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিলে তুমি চির বিদায়। জন্ম তোমার ১৯৩৫ সালের ১৯শে জানুয়ারী কৃষ্ণনগরে নদীয়া জেলায়, আদি নিবাস তোমার বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কয়ায়। পিতা তোমার বিশিষ্ট আইনজীবী শ্রী মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায়, মাতা তোমার শ্রীমতী আশালতা চট্টোপাধ্যায়। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে স্ত্রীর নাম শ্রীমতী দীপা চট্টোপাধ্যায়, দুই সন্তানের জনক তুমি তারা হন পৌলমী বসু ও সৌগত চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা তোমার সিটি কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন শুরু তোমার অল ইন্ডিয়া রেডিওতে অনুষ্ঠান ঘোষণায়। শ্রদ্ধেয় শিশির ভাদুড়ীর অভিনয় তোমাকে অনুপ্রাণিত করে অভিনয় জগতে আসায়, ১৯৫৯ সালে সত্যজিত রায়ের ” অপুর সংসার ” দিয়ে যাত্রা তোমার রূপালী পর্দায়। এক সত্যজিৎ রায়ের ১৪ টি ছবিতে করেছো অভিনয়, চলচ্চিত্রে আসার আগেও তুমি করেছো অভিনয় মঞ্চ থিয়েটার আর যাত্রাপালায়, অভিনয় ছাড়াও দক্ষ তুমি ছবির ডিরেক্টর, গদ্য ও কবিতা লেখায়। শুধু কি তাই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছো আবৃত্তি, ছবি ও প্রচ্ছদ আঁকা ও অনুবাদে সমান দক্ষতায়, তারপর থেকে চারুলতা,অরণ্যের দিন রাত্রি, স্ত্রী, তিন কণ্যা,অশণি সংকেত। এসব ছবির পরিচালক যে মান্যবর সত্যজিৎ। অশনিসংকেতের মাধ্যমে নতুন করে অাবিষ্কার করলে অনঙ্গ বউকে বাংলাদেশের ববিতা, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত র্বালিন চলচ্চিত্র উৎসবে ববিতা হয়ে উঠল এক কবিতা। প্রয়াত পরিচালক সত্যজিত রায়, নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে জানাই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা, তোমাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষা দিয়ে সৃষ্টি করলে এ অমূল্য সম্পদ বাংলাদেশের ববিতা। ছবির পর ছবি আসতে লাগলো নেইকো তোমার ঘুম, আরো আসলো সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে”, মৃণাল সেনের “আকাশ কুসুম”। সত্যজিৎ রায়ের “গণশত্রু” “তপন সিংহের ঝিন্দের বন্দী” “ক্ষুধিত পাষাণ”, সত্যজিৎ রায়ের “যদি জানতেম” পরিচালক পরমব্রতের “অভিযান”। অসিত সেনের “স্বরলিপি” তরুণ মজুমদারের সংসার সীমান্তে” ও “গণদেবতা”, আরো আসিল দীনেন গুপ্তের “বসন্ত বিলাপ” অজয় করের “সাতাপাকে বাঁধা”। সত্যজিতের “গনশত্রু” অারো করিলে অপর্না সেনের “পারমিতার একদিন”, অারো অাসিল বুদ্ধদেবের “মহা পৃথিবী ” সত্যজিতের “নৌকাডুবি” ও “উত্তরন”। “জয়বাবা ফেলুনাথের” মাধ্যমে তুমি হয়ে গেলে মানুষের ফেলুদা, অারো করিলে সত্যজিতের “দেবদাস” ও অজয় করের “পরিণীতা”। এবার অাসিল “প্রথম কদম ফুল ” ও অজয় করের “কাঁচ কাটা হীরে”, তারপর এলো “অপরিচিত” “চেনা-অচেনা”, ও তপন সিংহের ” হাটে বাজারে “। অাসিল ছবি ” কিনু গোয়ালার গলি” “কাপুরষ ” “বাক্স বদল ” ও “মনিহার”, অারো অাসিল “একই অঙ্গে এত রূপ” ও সুশীল ঘোসের “অঙ্গীকার “। অাসিল ” অতল জলের অাহবান” “বর্নালী” “হঠাৎ দেখা” ও “শেষ প্রহর”, অারো অাসিল মৃণাল সেনের “প্রতিনিধি” “বেনারসি ” ও “প্রস্তর স্বাক্ষর “। অারো করিলে তরুণ মজুমদারের ” একটুকু বাসা” ও “অাগুন”, ২০১৬ সালে জীবন সায়াহ্নে এসে করিলে তুমি “প্রাক্তন”। এলো ” তিন ভূবণের পরে ” “সাঝঁবাতি” “পদক্ষেপ ” ও “সোনার পাহাড় “, অরো অানিলে ” নতুন দিনের অালো” ও “বসু পরিবার”। ২০২০ সালে জীবন সায়াহ্নে এসে তুমি করিলে “শ্রাবনের ধারা “, এই ২০২০ সালেই অামরা হয়ে গেলাম তুমি হারা। এক টিভি অনুষ্ঠানে অামরা শুনেছি ৩০০টির ও বেশি তোমার করা ছবি, এটা কি তোমার হবি? তাই বুঝি এক সময় করলে বই “দেবী”। হে স্বপ্ন বিলাসী কবি কোথায় গেলো তোমার নতুন দিনের অালো? স্বপ্ন দেখা খারাপ নয় কিন্তুু অামরা রয়েছি অন্ধকারে নয়কো মোটে ভালো। হারিয়ে গেলে বাংলার অপু, উদয়ন পন্ডিত ও সকলের প্রিয় ফেলুদা, কেঁদে বুক ভাসায় তোমার নায়িকারা সব যারা ছিলেন তোমার পাশে সর্বদা। অারো করিলে “সমান্তরাল ” ” শাখা প্রশাখা” ” দশমাস দশদিন “, এখানো মুক্তির অপেক্ষায় অাছে তোমার ছবি “অবলম্বন”। হে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সিনেমা, নাটক, ছবি অাঁকার পাশাপাশি তুমি একজন কবি, তাই তো ২০১৯ সালে করিলে “অংশু মানের ছবি”। ইতিমধ্যে তোমার ১৪টি কবিতার বই হয়েছে প্রকাশিত, এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে অাছে কত কবিতা যা অপ্রকাশিত। রূপালী পর্দার বাইরে তুমি লিখেছো কত গল্প, কবিতা,নাটক, ভালো অাবৃত্তিকার হিসেবেও ধন্য তুমি, তোমার কত নামডাক। সাহিত্য পএিকাও সম্পাদনা করেছো যৌথভাবে নামতার “এক্ষণ”, কিংলিয়ার অার অশোক গুপ্তের মতো চরিত্রও করেছো রূপায়ন। যদিও তুমি চলে গেছ অাজ দৃষ্টির অড়ালে, তুমি বেঁচে থাকবে তোমার সৃষ্টিতে, না ফেরার দেশে চলে গেছো বটে তুমি থাকবে সকল বাঙ্গালির অন্তরে ও দৃষ্টিতে। গ্রেট অমিতাভ বচ্চন যথার্থই বলেছেন তুমি ছিলে এক প্রবাদ প্রতিম আইকনিক ব্যক্তিত্ব, তুমি ছিলে অতিশয় বিনয়ী, ছিল না অহংকার, ছিলো না কোন আমিত্ব। অভিনয়ের শ্রেষ্ঠত্বে পেয়েছিলে কতোপুরস্কার পেয়েছিেল অনেক খেতাবের ভূষণ, তার মধ্যে অন্যতম ” দাদা সাহেব ফালকে “পদ্মভূষণ” ও “বঙ্গভূষন”। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে, ২০০৪ সালে ভুষিত হলে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক খেতাব ” লিজিওয়ান অব অনারে। সময় ছিল না হাতে মোটে,নিতে কোন অবসর, তাই মহাকাল হাত ধরে নিয়ে গেল তোমাকে ওপার। প্রগতিশীল শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির হয়ে উঠলে এক অপরিহার্য্য অঙ্গ, এ ব্যাপারে তুমি কোন ছাড় দাওনি, রণে দাওনি কোন ভঙ্গ। অনেকেই তুলনা করেন কে বেশি বড় তুমি নাকি উত্তম কুমার? অামার মতে দুজনেই বড় স্ব-স্ব মহিমায় তাই এ প্রশ্ন অবান্তর। তোমাকে বাদ দিয়ে বাঙ্গালীর অস্তিত্ব হয়ে যায় ম্লান, প্রগতির পতাকা নিয়ে চলেছো সদাই, তোমার কীর্তি অনাদিকাল ধরে রবে অম্লান।

Print Friendly, PDF & Email

     একই ধরনের আরও কিছু খবর....

Top Posts & Pages

রাজবাড়ীতে গাঁজা ও হেরোইনসহ গ্রেপ্তার ৩
পাংশা থানা পুলিশের অভিযান  ২টি ওয়ান শুটারগান ৫রাউন্ড গুলি ও চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার ॥ গ্রেপ্তার ৪
রাজবাড়ীর নদী তীর সংরক্ষণ কাজের ভাঙন পরিদর্শনে সালমা চৌধুরী এমপি
পাংশা উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. পাতার করোনায় মৃত্যু
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যকে ফুল দিয়ে শোভিত গাড়িতে পৌছে দেওয়া হলো বাড়ি